টানা তিন দিনের ভারিবর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, নবগঠিত মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় বন্যা ও পাহাড় ধসের আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
প্লাবিত এলাকা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাহত
সরেজমিন দেখা গেছে, চকরিয়া পৌরসভার হাসপাতালপাড়া, থানা সেন্টার, নিউমার্কেট, ভাংগারমূখ, নামার চিরিংগা, বাশঘাটসহ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, কৈয়ারবিল, বরইতলী, ডুলাহাজারা, পূর্ব বড় ভেওলা, সাহারবিল, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা ও বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ভারি বর্ষণে চকরিয়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কার্যালয়ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কার্যালয়ের সীমানা প্রাচীরের একটি অংশ ধসে পড়ায় সরকারি কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটছে।
মাতামুহুরী উপজেলায় ব্যাপক প্লাবন
নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর, কোণাখালী, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, বদরখালী, ঢেমুশিয়া ও সাহারবিল ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে ঢেমুশিয়া জলমহালের পাঁচটি স্লুইসগেটের মধ্যে মাত্র একটি খোলা থাকায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টানাবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দ্রুত পানি বাড়লেও অধিকাংশ স্লুইসগেট বন্ধ থাকায় পানি স্বাভাবিকভাবে নামতে পারছে না। ফলে মাতামুহুরী, চকরিয়া ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
পাহাড়ধসে শিশুর মৃত্যু
সোমবার রাতে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আলমের ঝিরি এলাকায় পাহাড়ধসে মিনহাজ (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে কলিম উল্লাহ ও রুবি আক্তারের ছেলে। এ ঘটনায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রশাসনের সতর্কতা ও ব্যবস্থা
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে মাতামুহুরী নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের কারণে কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রও সতর্কতা জারি করেছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীদ দেলোয়ার বলেন, “ভারিবর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। পাশাপাশি উজানের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর স্লুইসগেট খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে উপজেলা প্রশাসনের জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, “মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১১.৮০ মিটার অতিক্রম করে ১১.৯৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।”
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনও ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি এড়াতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।



