রংপুরের গঙ্গাচড়ায় মহিপুর তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ধস নেমেছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও তিস্তার তীব্র স্রোতের কারণে ৯০০ মিটার দীর্ঘ এই প্রধান প্রতিরক্ষা বাঁধের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের অন্তত ৩০ মিটার নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পানির ঘূর্ণন স্রোতে সেখানে এখন তৈরি হয়েছে প্রায় ৬০ ফুট গভীর বিশাল ও বিপজ্জনক গর্ত। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
হঠাৎ পানি বৃদ্ধি ও বাঁধ ধস
শনিবার সন্ধ্যা থেকে তিস্তার পানি হঠাৎ করে বাড়তে শুরু করে। স্রোতের গতি এতই তীব্র ছিল যে, রাত ৮টার মধ্যেই বাঁধের ৩০ মিটার এলাকা নদীতে তলিয়ে যায়। পানির প্রবল ঘূর্ণিতে বাঁধের গোড়ায় প্রায় ৬০ ফুট গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে, যা সরাসরি সেতুর মূল পিলারকে হুমকিতে ফেলেছে। এরপর থেকে নদী পারের কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
রোববার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, তিস্তার উজানে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় শনিবার থেকে ডালিয়া পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে। নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে পানি বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই করে ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে মহিপুরে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধের উত্তর-পশ্চিম অংশে প্রায় ১শ মিটারজুড়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের শঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু এবং রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
পূর্বের ভাঙন ও অস্থায়ী মেরামত
এই বাঁধটি সেপ্টেম্বরেও একবার ভেঙে গিয়েছিল। তখন বাঁধের প্রায় ১০০ ফুট অংশ নদীতে বিলীন হয়েছিল। এই ভাঙন অংশে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাঁশের খুঁটি দিয়ে পাইলিং করে। তা শুক্রবার রাতেই পানির তোড়ে ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের কারণে রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়কের পাশাপাশি লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ২০০ পরিবার হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষ চলাচল করেন। সেতু বা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারী শুল্ক স্টেশনসহ লালমনিরহাট জেলার পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
স্থানীয় চেয়ারম্যানের ক্ষোভ
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা গত বছরই এলজিইডিকে অনুরোধ করে বলেছিলাম এখানে বাঁশের জোড়াতালি না দিয়ে যেন পাথরের সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী কাজ করা হয়। কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেনি। লাখ লাখ টাকা খরচ করে নদীর সামনে স্রেফ কিছু বাঁশ খাড়া করে রেখেছিল। আজ প্রকৃতির সামান্য আঘাতেই সেই ১৪ লাখ টাকার নড়বড়ে বাঁশের প্রতিরোধ খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। প্রশাসনের এই খামখেয়ালির খেসারত এখন এলাকাবাসীকেই দিতে হচ্ছে।’
এলজিইডি প্রকৌশলীর বক্তব্য
এই বিষয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘গত বছর ঢাকা থেকে আসা একটি বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ অনুসারেই সেখানে পাইলিংয়ের কাজ করা হয়েছিল। তীব্র স্রোতের মুখে সেটি ভেঙে গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।’
বন্যা সতর্কতা ও অন্যান্য এলাকা
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, তিস্তা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধিতে পানির প্রচণ্ড চাপ সামলাতে ডালিয়া পয়েন্ট এ ব্যারেজের সবকটি জলকপাট একসঙ্গে খুলে রাখা হয়েছে। রংপুর বিভাগসহ এর উজানে আগামী ৩ দিন ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় এই অঞ্চলের নিচু এলাকাগুলো নতুন করে প্লাবিত হতে পারে।
ভাঙনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার জানান, পানির তীব্র স্রোত ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো ইতোমধ্যেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। সেতু ও সড়ক বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর প্রধান নদী ধরলাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোববার ধরলা নদীর পানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদ-নদী পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টায় এ এলাকায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
রোববার সকাল ৬টায় তালুক শিমুলবাড়ী পয়েন্টে ধরলা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ২৯ দশমিক ৭৮ মিটার, যা সকাল ৯টায় কমে ২৯ দশমিক ৭৫ মিটারে নেমে আসে। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ৩০ দশমিক ৮৭ মিটার। বিকাল ৩টায় শিমুলবাড়ী পয়েন্ট পানি সমতল ২৯.৬৮ মিটার, (বিপৎসীমা ৩০.৮৭ মিটার) যা বিপৎসীমার ১১৯ সেমি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হঠাৎ ধরলাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি কখনো বাড়ছে আবার কখনো কমছে। তবে বারোমাসিয়া নদীর পানি কমে যাওয়ায় তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের পানিবন্দি পাট ও ভুট্টা খেতের পানি নেমে যাচ্ছে বলে জানান কৃষকরা।



