চলছে পাহাড়ে-সমতলে টানা অতি বর্ষণ। ফলে কক্সবাজার জেলার নদীগুলোতে নেমেছে পাহাড়ি ঢল। অবিরাম বর্ষণের পানি দ্রুত নামতে না পারায় জেলা জুড়ে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা-প্লাবন। ডুবে রয়েছে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। ডুবে রয়েছে অনেক গ্রামীণ গুরুত্বপূর্ণ নানা সড়ক-উপসড়কও। নদীর পানি বেড়ে ভেঙে গেছে অনেক এলাকার বাঁধ। এতে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। ডুবে গেছে শত শত পরিবারের রান্না ঘর। ফলে, চুলা জ্বালানো বন্ধ রয়েছে পানিবন্দী পরিবারগুলোতে। জেলায় কমপক্ষে ৮ লাখ মানুষ জলমগ্নতায় ভুগছেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
সড়ক ও রেলপথে পানি জমে দুর্ভোগ
বিল-ঝিলে ভরে যাওয়া পানি নামতে না পেরে প্লাবিত হচ্ছে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক। সড়কের রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি কাঠিরমাথা, মিঠাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পানেরছড়া, চাইল্যাতলীসহ আরও কয়েক এলাকায় রাস্তা পানির নিচে ডুবে রয়েছে। কয়েকটি জায়গায় দুই ফুটের উপর হয়ে পানি চলাচল করছে। কার, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ ছোট যানবাহন চলাচল এক প্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। বাস ও মিনিবাসগুলো কোনভাবে চলাচল করছে।
রামুর খুনিয়াপালং, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, জোয়ারিয়ানালা, রশিদ নগর, কচ্ছপিয়া, ফতেখারকুল, চাকমারকুল, উখিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম, কক্সবাজার সদরের পিএমখালী, বাংলাবাজার, খরুলিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা বুক সমান পানিতে ডুবে আছে। একই অবস্থা ঈদগাঁওর জালালাবাদ, পোকখালী, ইসলামাবাদ, ভোমরিয়াঘোনা, দরগাহপাড়া, মাইজপাড়ায়। এসব এলাকায় জমা পানি রেলপথের জন্য দ্রুত নিষ্কাশনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
রেলপথ নিয়ে ক্ষোভ
দক্ষিণ মিঠাছড়ির চাইল্যাতলীর ফারুক আহমদ বলেন, উন্নত যোগাযোগের জন্য গড়া রেলপথ কক্সবাজারে দুঃখ হিসেবে ধরা দিয়েছে। আগে বিলে জমা পানি সবখান দিয়ে নদীতে পড়তো। কিন্তু রেলপথ করতে গিয়ে খুব কম সংখ্যক কালভার্ট তৈরি করা হয়েছে। তাও অপরিকল্পিত ভাবে হওয়ায় নিচু এলাকার পানি নামতে বাঁধা পায়। ফলে, জমে থাকা পানি সড়কের উপর দিয়ে চলাচল করে। ডুকে যায় মানুষের ভিটা-বাড়িতে। অনেকের রান্নাঘর ডুবে থাকায় অসংখ্য পরিবার চুলা জ্বালাতে পারছে না।
ঈদগাঁও নাসির উদ্দিন বলেন, শুধু রামুতে নয়। রেলপথ জেলার চকরিয়া-ঈদগাঁও-রামু-সদর উপজেলার উপর দিয়ে চলে গেছে। সবখানেই এটি বাঁধের ভূমিকা পালন করছে। পানি চলাচলের কথা চিন্তা করে পরিকল্পিত ভাবে কম দূরত্বে কালভার্ট বসানো দরকার ছিল। কিন্তু না হওয়ায় পানি নিয়ে মানুষের ভোগান্তির অন্ত নেই।
মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে
অপরদিকে, চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চিরিংগা সেতু পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, চিরিংগা পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর বিপদসীমা ধরা হয় ৫ দশমিক ৮ মিটার। সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ৬ দশমিক ২৯ মিটার। মাতামুহুরীর উজানে বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
তিন উপজেলায় পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দী
চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা প্রশাসন জানায়, চকরিয়ার ১১টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা, পেকুয়ার ৭ ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা এবং মাতামুহুরীর ৭টি ইউনিয়নে ঢলের পানি প্রবেশ করেছে। চকরিয়ার বরইতলী, ফাঁসিয়াখালী, কৈয়ারবিল, কাকারা, লক্ষ্যারচর, সুরাজপুর-মানিকপুর, হারবাং, খুটাখালী, চিরিংগা, ডুলাহাজারা এবং পেকুয়ার পৌরসভা, টৈটং, মগনামা, বারবাকিয়া, রাজাখালী, উজানটিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল, পূর্ব বড় ভেওলা, ঢেমুশিয়া, ভেওলা মানিকচর, পশ্চিম ভেওলা, বদরখালী ইউনিয়ন তলিয়ে গেছে। এতে তিন উপজেলার গ্রামীণ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা। এসব ইউনিয়নে নিরাপদ পানি সংকটও দেখা দিয়েছে।
পাউবো সূত্র জানায়, মাতামুহুরীর নদীর কোনাখালী পুরুইত্যাখালী পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢলের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। পৌরসভার ভাঙারমুখ, আমাইন্যারচর, নামার চিরিংগা ও মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালীর পুরুইত্যাখালী, মরংঘোনা এলাকায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ বাঁধ রয়েছে ঝুঁকিতে।
নিখোঁজ এক মাদ্রাসাছাত্র
ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী নদীতেও দুই কূল উপচে ঢল নেমেছে। ঢলে ভেসে আসা লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে সাজেদ (১২) নামে এক মাদ্রাসাছাত্র পানিতে তলিয়ে নিখোঁজ রয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফুলেশ্বরী নদীর রামুর ঈদগড় পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ সাজেদ ঈদগড় ইউনিয়নের হাসনাকাটা কুনারপাড়া এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে। সে চরপাড়া নুরানি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও সহায়তা
ঈদগাঁওর ভোমরিয়াঘোনার সমাজকর্মী মোস্তফা কামাল জানান, পশ্চিম ভোমরিয়াঘোনা, চৌধুরীপাড়া, উত্তরপাড়া, কানিয়ারছড়াসহ নিম্নাঞ্চল ঢলের পানিতে ডুবে রয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এ ভোগান্তি পোহাচ্ছে এলাকার অর্ধ লাখ মানুষ। অনেকের রান্নাও বন্ধ। প্রশাসনিক কোন সহায়তা নেই।
চকরিয়া শান্তিবাজার এলাকার আবদুল হক বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে এলাকাটি পানিবন্দী-প্রশাসন কিংবা অন্য কারো সহযোগিতা আসেনি। রান্না বন্ধ থাকায় পরিবারের নারী-শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছি।
মাতামুহুরী কোনাখালীর বাসিন্দা হারুন রশিদ বলেন, এ বছর বৃষ্টিতে বিলে যেমন পানি বেড়েছে মাতামুহুরী নদীতেও তেমন পানি বেশি। প্রভাবশালীরা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে স্লুইসগেট বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
প্রশাসনের বরাদ্দ ও প্রস্তুতি
চকরিয়ার ইউএনও শাহীন দেলোয়ার জানান, মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার নতুন কিছু ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পাহাড় ধসে দুই শিশু নিহত হয়েছে। এরই মধ্যে চকরিয়া উপজেলায় ২০ টন ও মাতামুহুরীতে ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, মাতামুহুরীসহ জেলার আরও কয়েক নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি বেড়েই চলেছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, গত শনিবার ২৮ মিলিমিটার, রোববার ২৪০, সোমবার ১২৯, মঙ্গলবার ৬৯, বুধবার ১২৫ এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৫৭ মিলে ৬দিনে ৬৪৮মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আরও দুদিন অতি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো,আজাদের রহমান জানান, জেলায় প্রায় ৯৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তালিকা মিলেছে। ১৩জন রোহিঙ্গাসহ মারা গেছেন ১৯জন। দুর্যোগ বিবেচনায় ৬৪০টি সাইক্লোন শেল্টার খোলা রাখা হয়েছে। নিহত স্থানীয় ৪ পরিবারে এক লাখ আর আহত দু'পরিবারে ৩০ হাজার টাকা এবং ৫৫৫ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি ক্রমে অবনতি হচ্ছে। জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রাখা হলেও কেউ অবস্থান করছে বলে তথ্য নেই। দুর্যোগ মোকাবিলায় নগদ ১০ লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিকটন চাউল, প্রায় দেড় হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে। আরও বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।



