সিলেটের একটি অভিজাত হোটেলে গতকাল অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বক্তারা বলেছেন, বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হলো ঘর, তবে তা অবশ্যই দরজা-জানালা বন্ধ থাকতে হবে। গাছের নিচে, খোলা জায়গায় বা হাওরে অবস্থান করা যাবে না। স্থানীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
গোলটেবিল বৈঠকের মূল আলোচনা
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস: কমিউনিটিভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা’ শিরোনামে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে শুরু হয়ে বৈঠকটি বেলা দুইটা পর্যন্ত চলে।
বক্তাদের বক্তব্য
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, সিলেট অঞ্চলে প্রতিবছর এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটে। বজ্রপাতের বার্তা দুই ঘণ্টা আগে জানা গেলে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য গ্রাম পর্যায়ে সভা-সেমিনার প্রয়োজন। ১০ মের পর সিলেটে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম জানান, অধিদপ্তর বর্তমানে পাঁচ দিনের পূর্বাভাস দেয়, যার নির্ভুলতা প্রায় ৯০ শতাংশ। ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বজ্রপাতের ঘটনার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। দুটি আধুনিক ডপলার রাডার ব্যবহার করে মেঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দুই থেকে চার ঘণ্টা আগে তাৎক্ষণিক সতর্কতা জারি করা হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে সরকার বলেন, বাংলাদেশে ২০২০ সালে ৪২৭ জন এবং সম্প্রতি চার-পাঁচ দিনে ৭১ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন। অথচ ভেনেজুয়েলায় বছরে ৩০০ দিন বজ্রপাত হলেও মৃত্যু হয় মাত্র ১৩ জনের। সেখানে সচেতনতাকে ইতিবাচক সংস্কৃতিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এখানে গাছের নিচে বা অ্যারেস্টারের কাছে যাওয়া নিরাপদ—এমন ভুল ধারণা রয়েছে, যা আসলে ঝুঁকিপূর্ণ।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, সংস্থাটি হাওর অঞ্চলে ১৮ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করছে। শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোর ও ১৫-৩৫ বছর বয়সী যুবকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইয়ুথ ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মে-জুন মাসে হাওর অঞ্চলের শতভাগ মানুষের কাছে বজ্রপাতের সতর্কতা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি নরওয়ের মতো ‘বজ্রকোট’ তৈরির পরিকল্পনা এবং কৃষকদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো আর্থিক নিরাপত্তার প্রস্তাব দেন।
গবেষণা ও পরামর্শ
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক ধারণাপত্রে বলেন, বজ্রধ্বনি শুনলেই ঘরে যেতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফাতেমা আক্তার গবেষণাপত্রে মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার ওপর জোর দেন।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম গবাদিপশুর সুরক্ষায় হাওরে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। দোয়ারাবাজার উপজেলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল ওয়াহিদ মোবাইল নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতিতে তথ্য পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করেন। সিলেট জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মো. আবদুল কুদ্দুস বুলবুল তথ্য পেলে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে তৃণমূলে প্রচারের সম্ভাবনার কথা বলেন।
স্বেচ্ছাসেবী রেছনা বেগম স্পষ্ট নির্দেশনামূলক বার্তা ও মসজিদের মাইকের কার্যকারিতা উল্লেখ করেন। বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন আবহাওয়াবিদ এস এম কামরুল হাসান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের নিশাত সুলতানা, ইরার কামরুজ্জামান, শেখ কামরুল হোসেন, নিরাপদের রাশেদুল হাসান, প্রথম আলোর সুমনকুমার দাশ ও উপকারভোগী জহুর উদ্দিন। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।



