ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক কর্মকর্তা মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীর রিমান্ডকালীন মৌলিক চাহিদা পূরণ নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, মৌলিক চাহিদা পূরণে ‘সমস্যা কোথায়’? বিচারক মন্তব্য করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও একসময় ‘এ ধরনের কষ্ট’ সহ্য করতে হয়েছিল।
আদালতে মাঞ্জিল হায়দারের আইনজীবীর বক্তব্য
আসামিপক্ষের আইনজীবী কামাল হোসেন আদালতে জানান, গত ২৬ এপ্রিল মাঞ্জিল হায়দারের চুল কাটা ও দাড়ি কামানোর অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, ২১ বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করা এই ব্যক্তি ১৭ বছর মেজর পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ডিজিএফআইয়ের প্রশাসনিক ও উইং পর্যায়ে কাজ করেছেন। অসৎ কর্মকর্তা হলে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হতেন।
মামলার প্রেক্ষাপট ও রিমান্ডের আবেদন
গত ৯ এপ্রিল মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাঞ্জিল হায়দারকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাই আন্দোলনের সময় ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াদুদ নিহতের ঘটনায় নিউ মার্কেট থানায় দায়ের করা মামলায় তাকে তিন দফায় মোট ১২ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এরপর ২২ এপ্রিল রমনা মডেল থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় পাঁচ দিনের এবং ২৬ এপ্রিল আরও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
দুই দফায় ৯ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করে নতুন করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, রমনা জোনাল টিমের পরিদর্শক মো. আমজাদ হোসেন তালুকদার। আবেদনে বলা হয়, আসামি ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের’ প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ভূমিকা রেখেছেন। পরবর্তীতে সরকারবিরোধী কার্যক্রম গতিশীল করা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অস্থিতিশীল করা এবং অপপ্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
আরও বলা হয়, তিনি সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত এবং তার নির্দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গসংগঠন সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে মিছিল করেছে। এসব সংগঠনকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, অর্থ ও পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।
আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি
আসামিপক্ষের আইনজীবী কামাল হোসেন রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন আবেদন করেন। তিনি বলেন, ‘গত বছরের ১৫ নভেম্বর তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, অথচ মামলার ঘটনাটি ১২ সেপ্টেম্বরের। তখন তিনি কর্মরত ছিলেন। এ ধরনের অভিযোগ তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিনি পরিস্থিতির শিকার।’
রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘আসামি তারিক সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠ সহচর। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারিক সিদ্দিকির গাড়িচালক ও কেয়ারটেকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এক-এগারোর কুশীলবদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ড. ইউনূস সরকারের সময়সহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড এবং ইলিয়াস আলী গুমের সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।’
বিচারকের পর্যবেক্ষণ ও রায়
বিচারক প্রশ্ন তোলেন, ‘আসামি যদি তারিক সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠ হন, তাহলে ১৭ বছর মেজর পদেই কেন ছিলেন? তার তো পদোন্নতি হওয়ার কথা ছিল।’ জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, ‘এটা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। তাকে দিয়ে সুবিধা নেওয়া হয়েছে।’
চুল কাটা ও দাড়ি কামানোর বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন কোনো নিয়ম নেই।’ তখন বিচারক মন্তব্য করেন, ‘চুল কাটা, শেভ করার মতো বিষয়েও কি আদালতের নির্দেশ লাগবে? এগুলো তো মৌলিক বিষয়। খাওয়া-দাওয়া বা টয়লেটে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কি নির্দেশ দিতে হবে?’
শুনানি শেষে আদালত মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীকে আরও তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
মামলার বিবরণ
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা গত ১২ সেপ্টেম্বর রূপায়ন টাওয়ারের সামনে মিছিল করেন। তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে সংগঠনের কার্যক্রম সক্রিয় করা, রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং অপপ্রচার চালাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামিরা পালানোর চেষ্টা করলে কয়েকজনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় রমনা মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন উপপরিদর্শক (এসআই) আওলাদ হোসেন।



