চীনের গভীর সমুদ্র অভিযান: সাবমেরিন যুদ্ধে প্রাধান্যের লড়াই
প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর এবং আর্কটিক সাগরের অন্ধকার গভীরে এক নীরব কিন্তু ব্যাপক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে চীন। দেশটি সমুদ্রের তলদেশের বিস্তারিত ও নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করার পাশাপাশি পানির নিচে একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করছে। এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সাবমেরিন যুদ্ধে কৌশলগতভাবে এগিয়ে থাকা। নৌবিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ছাড়া আধুনিক সাবমেরিন যুদ্ধে জয়লাভ করা প্রায় অসম্ভব।
গবেষণা জাহাজের গতিবিধি ও সামরিক তৎপরতা
জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স প্রকাশ করেছে যে, চীনের ওশান ইউনিভার্সিটির গবেষণা জাহাজ ‘ডং ফাং হং–৩’ ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি গুয়ামের নিকটবর্তী সমুদ্রসীমায় বারবার যাতায়াত করেছে। এছাড়াও ভারত মহাসাগরের কৌশলগত এলাকাগুলোতেও এই জাহাজটির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাপানের কাছাকাছি সমুদ্রের তলদেশে চীন একটি শক্তিশালী সেন্সর নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে, যা পানির নিচে যেকোনো বস্তুর চলাচল সনাক্ত করতে সক্ষম। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ‘ডং ফাং হং–৩’ এই নজরদারি ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করেছে, যা ওই অঞ্চলে মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর সাবমেরিনের উপর নজরদারি আরও জোরদার করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণার আড়ালে চীন প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের তলদেশের নিখুঁত সামরিক মানচিত্র তৈরি করছে। গত মে মাসেও জাহাজটি একই এলাকায় গিয়েছিল এবং ২০২৫ সালের মার্চে এটি শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবর্তী জলসীমায় আঁকাবাঁকা পথে চলাচল করেছে। এই অঞ্চলটি বিশ্ববাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ মালাক্কা প্রণালির প্রবেশমুখ হিসেবে পরিচিত। নৌবিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন যে, যখন কোনো জাহাজ নির্দিষ্ট একটি এলাকায় বারবার সমান্তরালে এপাশ-ওপাশ করে, তখন এটি সমুদ্রের তলদেশের নিখুঁত ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করছে বলে ধরে নেওয়া যায়।
বেসামরিক গবেষণা নাকি সামরিক কৌশল?
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, জাহাজটি কেবল সমুদ্রের তলদেশের কাদা পরীক্ষা ও জলবায়ু গবেষণা করছে। তবে ওশান ইউনিভার্সিটির গবেষকদের লেখা একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধে প্রকাশ পেয়েছে যে, জাহাজটি আসলে সমুদ্রের গভীর তলদেশের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরির কাজও করেছে। নৌবিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এই মানচিত্র ও সেন্সর থেকে প্রাপ্ত তথ্য চীনের জন্য অমূল্য সম্পদ। এর মাধ্যমে চীন নিজেদের সাবমেরিন আরও নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে পারবে এবং শত্রুপক্ষের সাবমেরিন সহজেই খুঁজে বের করতে সক্ষম হবে।
তবে ‘ডং ফাং হং–৩’ একা নয়; এটি চীনের এক বিশাল প্রকল্পের ছোট অংশমাত্র, যেখানে কয়েক ডজন গবেষণা জাহাজ ও শত শত সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স ৪২টি গবেষণা জাহাজের গত পাঁচ বছরের গতিবিধি বিশ্লেষণ করেছে এবং চীন সরকারের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক নথিপত্র পরীক্ষা করেছে। রয়টার্সের তথ্য যাচাই করে নয়জন নৌযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন যে, চীনের এই গবেষণায় বেসামরিক উদ্দেশ্য থাকলেও এর পেছনে একটি বড় সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।
সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কেন্দ্রীভূত কার্যক্রম
জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, চীনের এই সমুদ্র জরিপ মূলত সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইনের চারপাশের জলসীমা, গুয়াম ও হাওয়াইয়ের কাছাকাছি এলাকা এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ওয়েক দ্বীপের চারপাশ। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অ্যান্টি–সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার কর্মকর্তা ও ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার অধ্যাপক জেনিফার পার্কার বলেন, তারা যে বিশাল পরিসরে এই কাজ করছে, তা কেবল খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য হতে পারে না। এর ব্যাপকতা দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, চীন গভীর সমুদ্রে যুদ্ধ করতে সক্ষম একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়তে চায়, যার মূল ভিত্তি হবে সাবমেরিন অপারেশন।
অধ্যাপক পার্কার ও অন্য বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেন যে, চীন কোনো তথ্য বেসামরিক গবেষণার জন্য সংগ্রহ করলেও সেটি শেষ পর্যন্ত সামরিক কাজেই লাগে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের অধীনে বেসামরিক গবেষণা ও সামরিক প্রযুক্তিকে একসুতোয় গেঁথে ফেলাই চীনের মূল কৌশল। বেইজিং এই নীতিকে ‘সিভিল-মিলিটারি ফিউশন’ বা বেসামরিক-সামরিক সংমিশ্রণ বলে অভিহিত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া
চলতি মাসে মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে নৌগোয়েন্দা দপ্তরের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাইক ব্রুকস জানান যে, চীন তাদের সমুদ্র জরিপ কার্যক্রম অভূতপূর্বভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর মতে, এই তথ্যের সাহায্যে চীনা সাবমেরিনগুলো সমুদ্রের নিচে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে, নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারবে এবং প্রয়োজনমতো সেন্সর ও অস্ত্র মোতায়েন করতে পারবে। মাইক ব্রুকস বলেন, গবেষণা জাহাজের আড়ালে এই সামরিক তথ্য সংগ্রহ এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও সম্প্রতি সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তৈরিতে নতুন করে জোর দিয়েছে। তবে তারা এ কাজে মূলত সামরিক জাহাজ ব্যবহার করে, যেগুলো ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রেখে চলতে পারে। চীনের বেসামরিক জাহাজগুলোও মাঝেমধ্যে ট্র্যাকিং বন্ধ করে দেয়, যা ইঙ্গিত দেয় যে রয়টার্সের বিশ্লেষণে যা উঠে এসেছে, বাস্তবে চীনের এই অভিযান তার চেয়ে অনেক বড় হতে পারে।
‘স্বচ্ছ মহাসাগর’ প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
২০১৪ সালে চীনের ওশান ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী উ লিক্সিন একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা দেন, যার লক্ষ্য ছিল সমুদ্রের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় শত শত সেন্সর বসিয়ে পুরো এলাকার পানির অবস্থা ও গতিবিধি পরিষ্কারভাবে জানা। বেইজিং লিক্সিনের প্রস্তাব করা এই প্রকল্পের নাম দেয় ‘ট্রান্সপারেন্ট ওশান’ বা ‘স্বচ্ছ মহাসাগর’। শানডং প্রাদেশিক সরকার দ্রুত সাড়ে আট কোটি ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দ দেয়। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় দক্ষিণ চীন সাগর থেকে এবং এখন সেখানে গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
দক্ষিণ চীন সাগরের সাফল্যের পর প্রকল্পটি এখন প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরে জাপান, ফিলিপাইন ও গুয়ামের আশপাশে শত শত সেন্সর ও ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। ভারত মহাসাগরে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে একটি সেন্সর নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে সমুদ্রের নিচের বিশাল পর্বতমালা ‘নাইনটি ইস্ট রিজ’-এর দিকে। কারণ, এই পথেই মালাক্কা প্রণালির প্রবেশদ্বার অবস্থিত, যা দিয়ে চীনের অধিকাংশ জ্বালানি তেল আসে।
চীনের গবেষকেরা এই কাজের বড় কৌশলগত গুরুত্ব দেখছেন। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের সেন্সর নেটওয়ার্ক তদারককারী গবেষক ঝো চুন গত বছর জানিয়েছিলেন যে, তাঁর কাজ দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতাকে অনেকটা এগিয়ে নিয়েছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ঝো চুন অঙ্গীকার করেন যে, এই উন্নত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অর্জনগুলোকে শিগগিরই সমুদ্রের বুকে নতুন ধরনের যুদ্ধ সক্ষমতায় রূপান্তর করা হবে।



