মধ্যপ্রাচ্য সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত পাকিস্তান: শান্তি প্রক্রিয়ার নতুন নায়ক
মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান: শান্তির নতুন নায়ক

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত পাকিস্তান: শান্তি প্রক্রিয়ার নতুন নায়ক

মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা রাজনীতিতে যখন যুদ্ধ ও শান্তির সূক্ষ্ম রেখাটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ায় অস্পষ্ট, তখন এক অপ্রত্যাশিত নায়ক হিসেবে বিশ্ব মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। দীর্ঘকাল ধরে ভঙ্গুর অর্থনীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আফগান সীমান্তের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে জর্জরিত এই পারমাণবিক শক্তিধর দেশটিই এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই সম্প্রতি এই খবর নিশ্চিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

হঠাৎ করেই আলোচনার নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে ইসলামাবাদ

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরান সরকারের মধ্যে সরাসরি আলোচনার জন্য নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে ইসলামাবাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে সম্প্রতি। এই কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হলে তা কেবল বৈশ্বিক তেলের বাজারে স্বস্তিই ফিরিয়ে আনবে না, বরং পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানকেও আমূল পরিবর্তন করে দেবে। নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে পরিচিত একটি রাষ্ট্র রাতারাতি পরিণত হতে পারে বৈশ্বিক সংকট সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে।

যদি এই আলোচনার উদ্যোগ ব্যর্থও হয়, তবুও পাকিস্তানের একটি বড় অর্জন ইতোমধ্যে হয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কয়েক দশক পর দেশটি কেবল যুদ্ধের ময়দান হিসেবে নয়, বরং শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনাকারী হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেছে। ইসলামাবাদের জন্য এই সাফল্যের পুরস্কার কেবল প্রতীকী নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিকে থাকার চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে মধ্যস্থতা

ইসলামাবাদভিত্তিক এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছেন, এই আলোচনা এগিয়ে নেওয়া পাকিস্তানের জন্য কোনও ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং ‘আত্মরক্ষা’র কৌশল মাত্র। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি সইবার ক্ষমতা পাকিস্তানের নেই বলেই এই উদ্যোগ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর কঠিন শর্তে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বিপর্যস্ত। কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে অতিরিক্ত চালান নিশ্চিত করা না গেলে দেশটিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) তীব্র সংকট দেখা দেবে।

এছাড়া ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটারের অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে, যা বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্রপন্থি গোষ্ঠীদের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই সীমান্ত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে, যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।

সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঝুঁকি

সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে। পাকিস্তানের ২৪ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিয়া মুসলিম, যা ইরানের বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম শিয়া সম্প্রদায়। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবরে পাকিস্তানের একাধিক শহরে প্রাণঘাতী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। তেহরানের যেকোনও বিপর্যয় পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

জেনারেল আসিম মুনির কূটনৈতিক ভূমিকা

এই কূটনৈতিক উদ্যোগের মূলে রয়েছেন পাকিস্তানের ক্ষমতাধর সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির। গত বছর ভারতের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সামরিক উত্তেজনার পর থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের প্রভাব বাড়িয়েছেন। জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তার চমৎকার কাজের সম্পর্ক রয়েছে এবং ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাকে নিজের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ওমান বা কাতারের মতো দেশগুলো আগে মধ্যস্থতা করলেও বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানই সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী। এর কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:

  • পাকিস্তানে প্রায় ৪ কোটি শিয়া ধর্মাবলম্বী রয়েছে, যা ইরানের সঙ্গে একটি গভীর আত্মিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্র তৈরি করে।
  • পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানে কোনও স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটি নেই, যা তেহরানের কাছে একে একটি ‘সার্বভৌম’ ও গ্রহণযোগ্য ভেন্যু হিসেবে তুলে ধরে।
  • ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের স্বার্থ রক্ষাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানই কাজ করে আসছে।

আলোচনার প্রস্তুতি ও শর্তাবলি

যদিও ওয়াশিংটন বা তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বৈঠকের কথা স্বীকার করেনি, তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, পাকিস্তান ইতোমধ্যে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের একটি বৈঠকের লজিস্টিক প্রস্তুতি শুরু করেছে।

মার্কিন সূত্রের খবর অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক প্রস্থান খুঁজছে। পাকিস্তানের মাধ্যমে ১৫ দফা প্রস্তাব তেহরানকে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  1. ইরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া
  2. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ সীমিত করা
  3. ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে লাগাম টানা
  4. বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া

অন্যদিকে, ইরানও তাদের শর্ত জুড়ে দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যা বন্ধ করা
  • যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান
  • হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি

কঠিন ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ

ইসলামাবাদের জন্য এই পথ মোটেও মসৃণ নয়। একদিকে ট্রাম্পের অনিশ্চিত মেজাজ, অন্যদিকে ইরানের অনড় অবস্থান, সব মিলিয়ে এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, "পাকিস্তান যুদ্ধের আগুনের সবচেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে আছে এবং উপসাগরীয় অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই যুদ্ধ থামানোই তাদের প্রধান তাড়না।"

এই কূটনৈতিক উদ্যোগ শুধু পাকিস্তানের জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে, যে দেশটি যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে শান্তির বীজ বপন করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে চলেছে।