মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণে মোদির ইসরায়েল সফর: কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্য
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল বুধবার দুই দিনের সফরে ইসরায়েলে গেছেন। তেল আবিব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু তাঁকে স্বাগত সংবর্ধনা দেন। ২০১৭ সালে মোদি প্রথমবার ইসরায়েল সফর করেছিলেন, যা ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইসরায়েল সফর। এবারের সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়েছে এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।
কাদের সঙ্গে বৈঠক ও কী আলোচনা হবে?
ভারত ও ইসরায়েল দুই দেশের কর্মকর্তাদের মতে, এ সফরের মূল লক্ষ্য কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করা। গত সেপ্টেম্বরে ভারত ও ইসরায়েল একটি নতুন দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি সই করেছে, যা ১৯৯৬ সালের চুক্তির পরিবর্তে বিনিয়োগকারীদের জন্য নিশ্চয়তা ও সুরক্ষা দেবে। পাশাপাশি বিদ্যমান নিরাপত্তা চুক্তি হালনাগাদের উদ্যোগও রয়েছে।
দ্য হিন্দুস্তান টাইমস–এর প্রতিবেদন বলছে, দুই দেশ যৌথভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র–প্রতিরোধীব্যবস্থা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। এ ছাড়া আগামী কয়েক বছরে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ১০ বিলিয়ন (১ হাজার কোটি) ডলারের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র–প্রতিরোধীব্যবস্থা, লেজারভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিসহ নানা বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার বিষয় আছে।
ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের পটভূমি
স্বাধীনতার আগে ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে ভারত ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা দেশগুলোর মধ্যে ভারতও ছিল। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘে ইসরায়েলের সদস্যপদের বিরুদ্ধেও ভোট দেয় নয়াদিল্লি। যদিও ১৯৫০ সালে ভারত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৯২ সালে।
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়। বর্তমানে এশিয়ায় চীনের পর ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল ২০ কোটি ডলার; ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে।
ভারত ইসরায়েলে রত্ন, ডিজেল, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম রপ্তানি করে; আমদানি করে পেট্রোলিয়াম, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন সরঞ্জাম।
কেন এ সফর তাৎপর্যপূর্ণ?
এ সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারত্ব সম্প্রসারণের নিন্দা জানিয়ে ১০০টির বেশি দেশের সঙ্গে ভারতও সম্প্রতি একটি বিবৃতিতে সই করেছে। এদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নজিরবিহীন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মোদি প্রথম বিশ্বনেতা হিসেবে নেতানিয়াহুকে ফোন করেছিলেন। সেই থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে ভারতের দৃঢ় সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট।
একই সময়ে নেতানিয়াহু র্যাডিক্যাল সুন্নি ও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের বিরুদ্ধে একটি আঞ্চলিক জোট, যাকে তিনি হেক্সাগন বলেছেন—গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের নাম উল্লেখ করা হয়। তবে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রস্তাব সমর্থন করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতানিয়াহুর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নেতা হিসেবে মোদির সফর অনেকের চোখে ইসরায়েলি নীতির প্রতি সমর্থন হিসেবেই দেখা হবে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব
এদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাও বেড়েছে। ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়ন নিয়ে ২০১৬ সালে তেহরানের সঙ্গে ভারতের বড় চুক্তি হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জোরদারের পর নয়াদিল্লি সেখান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে বলে খবর।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে চুক্তি না হলে সীমিত হামলার কথা বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা বাড়লে ইসরায়েল সামনের সারির অংশীদার হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সব মিলিয়ে মোদির এ সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের বিষয় নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল কূটনৈতিক সমীকরণে ভারতের অবস্থানও স্পষ্ট করবে।
