কুমিল্লায় আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মারধরে ফুটবলপ্রেমী শরিফুল নিহত: স্বজনদের আহাজারি
কুমিল্লায় ফুটবলপ্রেমী শরিফুল নিহত: স্বজনদের আহাজারি

কুমিল্লায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা চলাকালে তুচ্ছ ঘটনার জেরে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মারধরে নিহত হয়েছেন মিসর সমর্থক মো. শরিফুল ইসলাম (৩৮)। বুধবার দুপুরে কুমিল্লা নগরের মঠপুষ্করনী এলাকার ভাড়া বাসায় তাঁর স্বজনদের আহাজারি থামছে না। কাজের খোঁজে প্রায় আট মাস আগে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার উত্তর চেরাংগা গ্রাম থেকে কুমিল্লায় আসেন শরিফুল। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন স্ত্রী বিউটি বানু ও দুই কন্যাসন্তানকে। কুমিল্লা নগরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মঠপুষ্করনী এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থেকেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা (মিশুক) চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি।

ঘটনার বিবরণ

গত মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় মহসিন মিয়ার চায়ের দোকানে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ওই অটোরিকশাচালককে মারধর করা ব্যক্তিরা আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলেন। আর নিহত শরিফুল মঙ্গলবার রাতের খেলায় মিসরের সমর্থন করলেও তিনি মূলত ব্রাজিল সমর্থক।

স্বজনদের আহাজারি

শরিফুলের স্ত্রী বিউটি বানু কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘খেলা নিয়া মানুষটারে এইভাবে মাইরা ফালাইবো, এইটা কেমন কথা? আমার দুইডা মাইয়া ছাওয়াল। এহন কারে বাবা কইয়া ডাকবো? আমার দুইডা মাইয়া এতিম হইয়া গেল। যারা আমার স্বামীরে খুন করছে, মুই তাদের কঠিন বিচার চাই। মুই গরিব-অসহায় মানুষ, এহন এই দুইডা মাইয়ারে কেমনে মানুষ করমু? হামার গোটা পরিবারডাই শেষ হইয়া গেল।’ শরিফুলের দুই মেয়ে নীলফামারীতে থাকা অবস্থায় পড়াশোনা করত। বড় মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি আর ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শরিফুল চেয়েছিলেন মেয়েদের কুমিল্লায় স্কুলে ভর্তি করতে, কিন্তু তাঁর সেই আশা আর পূরণ হলো না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশি ব্যবস্থা

বুধবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শরিফুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এদিন বিকেলে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। কিন্তু বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত এ ঘটনায় কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় কোনো মামলা হয়নি। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাউকে আটকও করতে পারেনি পুলিশ। কোতোয়ালি মডেল থানার ক্যান্টনমেন্ট পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ উপপরিদর্শক সংকর কান্তি দাস বলেন, ‘মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কে বাদী হবেন, তা ঠিক করে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। পুলিশ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আটকের চেষ্টা চালাচ্ছে।’

প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও শরিফুলকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় সঙ্গে থাকা আরেক অটোরিকশাচালক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘তাঁরা সবাই মহসিন মিয়ার চায়ের দোকান খেলা দেখছিলেন। অনেক মানুষ ছিল। খেলার শুরুতে মেসি পেনাল্টি মিস করলে শরিফুল আর্জেন্টিনার এক সমর্থককে বলেন, “তোমার বাপে তো গোল দিতে পারল না”। মূলত এই কথা থেকেই বাগ্বিতণ্ডা শুরু। সেখানেই শরিফুলকে তাঁরা কয়েকজন মারধর করেন। হামলাকারীরা স্থানীয় দেখে শরিফুল এক পর্যায়ে পাশের একটি মেসে চলে যান। তখন সেখানে গিয়েও তাঁকে মারধর করা হয়। এরপর দোকানের সামনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শরিফুল। তাঁরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’

হামলাকারীদের অবস্থা

ঘটনার পর থেকেই চা দোকানি মহসিন মিয়ার দোকান বন্ধ আছে। বুধবার সকালে তিনি ও তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তাঁরা ধরেননি। দুপুরের পর থেকে মুঠোফোন বন্ধ। শরিফুলকে মারধরে মূল হোতা হিসেবে যেই দুজন তরুণের নাম সামনে এসেছে, তাঁরাও এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। এ ছাড়া ওই দুই তরুণের পরিবার শরিফুলের পরিবারকে টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

শ্বশুরের প্রতিক্রিয়া

শরিফুলের শ্বশুর মতিউর রহমান বলেন, ‘গতকাল রাতে আমাকে কল করে বলা হয়েছে, দ্রুত কুমিল্লা আসতে হবে জামাই অসুস্থ। আমরা ইমার্জেন্সি কুমিল্লা এলাম। এসে দেখলাম শরিফুলের লাশ। এটা কোন সমাজ আর কেমন দেশ? খেলার সময় কথা–কাটাকাটির জেরে একজন মানুষকে মেরে ফেলবে? আমার মেয়েটা এখন দুইটা কন্যাসন্তান নিয়ে কীভাবে বাঁচবে? আমরা ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার চাই।’

পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা এলাকার উঠতি বয়সী তরুণ। আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যে খেলা শেষে বাগ্বিতণ্ডা হয়। তখন শরিফুলের মাথায় কিল-ঘুষি মারা হয়। পরে শরিফুলকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ধরার চেষ্টা করছে।’