তিস্তা প্রকল্পে চীনের ভূমিকা: ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়ছে
তিস্তা প্রকল্পে চীনের ভূমিকা: ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের (টিআরসিএমআরপি) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চুক্তিকে ঘিরে ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেনস নেকের কাছে প্রকল্পটির অবস্থান নয়াদিল্লির জন্য নতুন নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

প্রকল্পের পটভূমি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশ তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি চুক্তি সই করে। এর মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক আরও জোরদার হলেও, প্রকল্পটির অবস্থান ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

তিস্তা প্রকল্প কী?

৪১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তঃসীমান্ত তিস্তা নদীর উৎপত্তি পূর্ব হিমালয়ে। এটি ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নদীতে মিলিত হয়েছে। টিআরসিএমআরপি একটি বৃহৎ নদী ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্প। এতে নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং নদীর গতিপথ স্থিতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নদীতীরজুড়ে সড়ক, সেচব্যবস্থা, নগরকেন্দ্র, পর্যটন সুবিধা ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বন্যার ক্ষতি কমানো, নৌচলাচলের উন্নতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা

২০১৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চীনের প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান পাওয়ারচায়নার সঙ্গে প্রকল্পটির মাস্টারপ্ল্যান ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা তৈরির জন্য সমঝোতা স্মারক সই করে। ২০১৯ সালে এটি সরকারি কাঠামো পায় এবং ২০২০ সালে মেগা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প হিসেবে প্রকাশ করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করলেও অর্থায়ন নিশ্চিত বা চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি। বর্তমান সরকার সম্ভাব্যতা সমীক্ষার নতুন চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটিকে আবারও এগিয়ে নিচ্ছে।

কেন চীনকে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ?

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিপুল অর্থায়ন ও উচ্চ পর্যায়ের প্রকৌশল দক্ষতা প্রয়োজন। নদী থেকে ১৪০ মিলিয়ন ঘনমিটার পলি অপসারণ, ১৭১ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার, ৮২টি জেটি নির্মাণ, বাঁধ শক্তিশালীকরণ এবং ২২৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আরেকটি কারণ হলো তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা। ২০২৪ সালে ভারত এক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের প্রস্তাব দিলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেটি এগোয়নি। এরপর চীনের সঙ্গে সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত হয়।

ভারতের উদ্বেগ কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প এলাকার অবস্থান ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার লাগোয়া এবং শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি। মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রস্থের এই করিডরই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ। কৌশলগত বিশেষজ্ঞ তারা কার্থার মতে, বাংলাদেশে চীনের এই প্রভাব ভারতের দুই ফ্রন্টের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। পাকিস্তান যখন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বেইজিং তার কৌশলগত পরিধি বাড়াচ্ছে।

কার্থা ‘ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটাল’-কে বলেন, “ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে বেইজিংয়ের অবস্থান নেওয়ার অর্থ হলো ভারত এখন নিশ্চিতভাবেই দুই ফ্রন্টের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যেখানে পাকিস্তানের নজর সব সময়ই চীনের দিকে রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, এমনকি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। চীন অত্যন্ত কার্যকরভাবে তার সফট পাওয়ার প্রদর্শন করছে।”

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) গবেষকদের মতে, চীনের সম্পৃক্ততা তিস্তা ইস্যুকে শুধু পানিবণ্টন বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না; বরং এটি আরও বড় নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের অবস্থান

৩ জুন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে এএনআই নিউজ এজেন্সিকে জানান, “তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিমধ্যে ঢাকাকে জানানো হয়েছে এবং তিস্তা ইস্যুতে ভারতের পদক্ষেপ সমস্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় ও উন্নয়নকে বিবেচনায় নিয়েই নির্ধারিত হবে। আমরা তিস্তা ইস্যুর সামগ্রিক পদক্ষেপে এই সংক্রান্ত সমস্ত উন্নয়নকে বিবেচনায় রাখব।”

২০২৫ সালের অক্টোবরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রি বলেছিলেন, ভারত গঙ্গা ও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তিসহ পানি সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে। বাংলাদেশি সংবাদপত্র দ্য ডেইলি স্টার-এর বরাত দিয়ে মিস্রি বলেন, “গঙ্গা পানি চুক্তি এখনও বৈধ রয়েছে এবং আমরা যৌথ নদী কমিশনের কাঠামোর মধ্যে এ সংক্রান্ত আলোচনা অব্যাহত রাখব।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পূর্ণাঙ্গ প্রকল্পে রূপ নিলে তিস্তা কেবল ভারত-বাংলাদেশের পানিবণ্টন ইস্যু থাকবে না; এটি ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে