ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর দেশটির আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে তাঁর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। চলতি বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গত মার্চ মাসে নেতানিয়াহু দম্ভভরে বলেছিলেন, 'আমরা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছি।' কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণের আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন, যাতে ইরানের শর্ত মেনে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের কথাও রয়েছে।
নেতানিয়াহুর চ্যালেঞ্জ
দুর্নীতির অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সময় জনগণকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে নেতানিয়াহু আগে থেকেই সমালোচনার মুখে রয়েছেন। এখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানোর বিষয়েও তাঁকে ভোটারদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু অক্টোবরের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। জনমত জরিপ অনুযায়ী, তাঁর ডানপন্থী জোট পরাজয়ের পথে রয়েছে। তবে ১৯৯০-এর দশক থেকে ইসরায়েলের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে আসা নেতানিয়াহুকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে নতুন সরকার গঠন সম্ভব হবে বলে খুব কম ইসরায়েলি বিশ্বাস করেন।
স্থায়ী বিজয় না পাওয়া
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। সমর্থকদের কাছে তিনি 'কিং বিবি' নামে পরিচিত, কিন্তু বিরোধীদের সীমাহীন ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু। তাঁর লিকুদ পার্টি তাঁকে কঠোর নিরাপত্তাপন্থী নেতা হিসেবে তুলে ধরে, যিনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি ঠেকিয়ে রেখেছেন এবং ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ২০২৫ সালে তিনি বলেছিলেন, 'জর্ডান নদীর পশ্চিমে কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র থাকবে না।' তবে হামাসের হামলার আগেই নিরাপত্তা ব্যর্থতার কারণে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাজা ও লেবাননে অভিযান সামরিক সাফল্য এনে দিলেও স্থায়ী বিজয় তিনি পাননি। বরং তাঁর অভিযানের কারণে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ইসরায়েলি সামরিক মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সমালোচনা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ
বেশির ভাগ ইসরায়েলি গাজা যুদ্ধকে সমর্থন করলেও অনেকেই নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলের বিরোধিতা করেছেন। শীর্ষ জেনারেল এবং জিম্মিদের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, এ যুদ্ধ নিয়ে তাঁর স্পষ্ট কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা ছিল না। ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের সমঝোতা স্মারক ইসরায়েলকে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করবে। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন, 'নেতানিয়াহু যুদ্ধ হেরে গেছেন। তিনি কোনো কিছুই অর্জন করতে পারেননি।' নেতানিয়াহু এই সমালোচনার নিন্দা করে বলেছেন, এসব ইসরায়েলের অর্জনকে খাটো করে দেখানোর প্রচেষ্টা। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ উঠেছে, যা ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, যাকে তিনি 'অযৌক্তিক' বলেছেন।
আন্তর্জাতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার ঘটনায় নেতানিয়াহুর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। অনেক ইসরায়েলি মনে করেন, হামাসের হামলার পর গাজায় সামরিক অভিযান নিয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনা 'ন্যায়সংগত' নয়। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিকেরা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে 'যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করার' অভিযোগ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইসরায়েলের প্রতি দুদলের রাজনৈতিক সমর্থনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে 'উন্মাদ' বলেছেন। নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জন্য পথ এখন অত্যন্ত কঠিন।



