হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা ও লেবানন সংঘাতের তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যকার প্রথম দফার উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। উদ্বোধনী অধিবেশনে তেহরানের পক্ষ থেকে আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে হামলার হুমকির কারণে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
বৈঠকে অগ্রগতি ও কর্মপরিকল্পনা
তবে বৈঠক শেষে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তানের এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে সম্মত হয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কাতারের মালিকানাধীন সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য রিসোর্ট বুর্গেনস্টকে চলতি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও এই টেকনিক্যাল আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, উভয় পক্ষই লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করার একটি নির্দিষ্ট পন্থায় সম্মত হয়েছে এবং বিতর্কিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ যোগাযোগ লাইন চালু করেছে।
ইরানের দাবি ও মার্কিন নীরবতা
আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি দাবি করেছেন, ইরান তাদের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা মওকুফ, কিছু জব্দ হওয়া আন্তর্জাতিক সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ইরানের জন্য একটি বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছে। তবে আলোচনার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, পারমাণবিক বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার জন্য সমঝোতা স্মারকের অন্যান্য শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক; যার মধ্যে ইরানের অবমুক্ত সম্পদ হস্তান্তর এবং ইরানি তেল রফতানির ওপর মার্কিন ছাড়পত্র জারির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
সোমবার ভোরের দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, পাকিস্তান ও কাতারের অক্লান্ত মধ্যস্থতায় লেবানন যুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রফতানির নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করা হয়েছে, অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে, কিছু জব্দ সম্পদ অবমুক্ত হয়েছে এবং ইরানের জন্য একটি বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে প্রথম আসল পরীক্ষা হবে ‘লেবানন ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠন করা, যা দুই পক্ষের সংঘাত এড়াতে কাজ করবে বলে উল্লেখ করেন আরাঘচি।
পৃথক বিবৃতিতে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই কূটনৈতিক অগ্রগতিকে একটি বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রামের অংশ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ফুটবল মাঠ থেকে শুরু করে আলোচনার টেবিল কিংবা যুদ্ধক্ষেত্র, ইরানি হিসেবে আমাদের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ মূলত একটি বড় সংগ্রামের অংশ, আর তা হলো আমাদের প্রিয় জনগণের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা।
প্রাথমিক চুক্তি ও হরমুজ প্রণালি
প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বৈরিতা ও সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল, যেখানে ইসরায়েল একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে আসছিল।
সুইজারল্যান্ডের এই বৈঠকে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা মুখোমুখি হন। সেখানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স লেবাননের চলমান সহিংসতার প্রভাবকে কিছুটা হালকা করে দেখিয়ে বলেন, সেখানে শত্রুতা অবসানের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে ভ্যান্স বলেন, এই ধরনের বিষয়গুলো সবসময়ই কিছুটা জটিল হয়ে থাকে।
ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
সুইজারল্যান্ডে যখন আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি তাদের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে না রাখে তবে তাদের ওপর পুনরায় হামলা চালানো হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছিলেন, লেবাননে গোলমাল সৃষ্টির পেছনে থাকা তাদের উচ্চ বেতনভোগী প্রক্সিদের ইরানকে এখনই থামাতে হবে। তারা যদি তা না করে, তবে আমরা আবারও ইরানের ওপর খুব কঠিন আঘাত হানব, ঠিক যেমনটা গত সপ্তাহে করেছিলাম, তবে এবার আঘাত হবে আরও তীব্র!!!
শুক্রবার লেবাননে একটি নতুন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হলেও সেখানে লড়াই থামার লক্ষণ খুবই সামান্য ছিল। এর ফলে গত শনিবার ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানায়।
জ্বালানি সরবরাহে বিপর্যয়
উল্লেখ্য, বিগত প্রায় চার মাস ধরে এই আন্তর্জাতিক জলপথটি বন্ধ থাকার কারণে মানব ইতিহাসের বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছিল। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি একটি সামরিক সূত্রের বরাতে গতকাল রবিবার জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই প্রণালি পার হওয়ার জন্য নতুন কোনও জাহাজকে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
তবে দুই দিন ধরে চলা ইসরায়েলের তীব্র বিমান হামলার পর, গতকাল রবিবার লেবাননে গত কিছুদিনের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল এবং রাত পর্যন্ত সেখানে বড় ধরনের কোনও সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড



