হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার
হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আঞ্চলিক সহযোগীদের সঙ্গে একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন, যার লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। তবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। তিনটি দেশে ৭২ ঘণ্টার কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে এই পরিকল্পনার জন্য ব্যাপক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়েছে।

কূটনৈতিক তৎপরতা ও বৈঠক

গত সোমবার আরাগচি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সেন্ট পিটার্সবার্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এর আগে তিনি দুই দিনে দুবার ইসলামাবাদ সফর করেন এবং মাঝখানে ওমানের মাসকটে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, মাসকটের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মাসকটের আলোচনায় হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য সমঝোতার রূপরেখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তবে পারমাণবিক ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা হয়নি; পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার জন্য সেটিকে রেখে দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরান তাদের সর্বশেষ প্রস্তাবটি পাকিস্তানের কাছে জমা দিয়েছে। ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই পক্ষের সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউস ইরানের প্রস্তাবের বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেনি। মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র 'গণমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো আলোচনা করবে না' এবং শুধু এমন চুক্তি করবে যা মার্কিন জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং কখনোই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেবে না। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক আলোচনা পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়, তবে প্রস্তাব নিয়ে তিনি খুশি নন বলে জানিয়েছেন। গত রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ইতিমধ্যেই জানে তাদের কী করতে হবে এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাকিস্তানের মধ্যস্থতা

পাকিস্তানে দুবারের সফরের প্রথম দফায় গত শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তিনি মাসকট সফর করেন এবং রোববার পাকিস্তানে ফিরে আবারও আসিম মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তারপর মস্কোর উদ্দেশে রওনা দেন। দেশ ছাড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আরাগচি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান 'গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা' পালন করেছে। তিনি আরও বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের ভুল পন্থা ও অতিরিক্ত দাবির' কারণে আগের দফার আলোচনা কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেছেন, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।

আঞ্চলিক সমর্থন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা

পাকিস্তান, ওমান ও রাশিয়া সফর ছাড়াও গত কয়েক দিনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কাতার, সৌদি আরব, মিসর ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল-থানি সরাসরি আরাগচির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সমুদ্রপথ যেন 'কোনো দর-কষাকষির হাতিয়ার বা চাপ প্রয়োগের কৌশল' না হয়ে ওঠে, তা নিয়ে সতর্ক করেন। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদকে যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিস্থিতি জানানো হয়েছে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি কাতার ও ইরান দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেই কথা বলেছেন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ নোয়েল বারো জোর দিয়ে বলেছেন, এ সংকটে ইউরোপ 'গঠনমূলক ভূমিকা' রেখেছে। মাসকটে আরাগচির সঙ্গে বৈঠকের পর ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি 'নৌ চলাচলের স্থায়ী স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত সমাধান' খোঁজার আহ্বান জানান।

সম্ভাব্য সমঝোতার চ্যালেঞ্জ

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থেফার বলেন, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা এখনো অনেক দূরের বিষয়। কারণ, ইরানের দাবি শুধু হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তারা পুরো আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের দাবি করছে এবং সাম্প্রতিক হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলো এমন কিছু দিতে রাজি নয়। ইরানি সাংবাদিক ও বিশ্লেষক রেজা আফজাল বলেন, হরমুজ ইস্যুতে ইরানের অভ্যন্তরীণ জনমতও প্রায় উপেক্ষিত হয়। তাঁর মতে, দেশটির জনগণের বড় অংশ কোনো বাস্তব ছাড় ছাড়া হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে। ওয়াশিংটন যদি কোনো সমঝোতায় না আসে, তাহলে তেহরান হরমুজকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করবে।

সময়সীমার চাপ

বর্তমানে একাধিক সময়সীমা একসঙ্গে এসে পড়েছে। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ১ মের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার সময়সীমা, ট্রাম্পের চীন সফর ও আসন্ন হজ মৌসুম। মে মাসের শেষ দিকে সৌদি আরবে লাখো হাজির আগমন ঘটবে, ফলে ওই সময় সৌদি আরবের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা চাপের মুখে পড়বে। এতে একটি বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হলে তা বিশেষভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। পাকিস্তানি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, ইসলামাবাদ আবারও আনুষ্ঠানিক আলোচনা আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। তবে বাস্তব আলোচনা সম্ভবত জনসমক্ষে নয়, বরং গোপন পরিসরেই চলবে; কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছালে তবেই তা দৃশ্যমান হবে।