রাশিয়া-আফগান সামরিক চুক্তি: পাকিস্তান উদ্বিগ্ন নয়, চুক্তি প্রতীকী
রাশিয়া-আফগান সামরিক চুক্তি: পাকিস্তান উদ্বিগ্ন নয়

রাশিয়া ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সামরিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নয় পাকিস্তান। ইসলামাবাদের শীর্ষ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য মূলত পুরোনো রুশ সামরিক সরঞ্জামের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, কোনো অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ নয়। ফলে এটি ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যকার বিদ্যমান নিরাপত্তা ভারসাম্যে কোনো বড় পরিবর্তন আনবে না।

চুক্তির বিবরণ

গত ২৭ মে মস্কোয় রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সের্গেই শোইগু এবং তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদের মধ্যে এই দ্বিপাক্ষিক সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তি সই হয়। এর আগে, গত জুলাইয়ে তালেবানকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেয় রাশিয়া।

আফগান গণমাধ্যমের দাবি, এই চুক্তির আওতায় অস্ত্র বিনিময়, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সরঞ্জাম মেরামত ও যৌথ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের মতো বিষয়গুলো থাকতে পারে। তবে আফগানিস্তানে নিযুক্ত রাশিয়ার বিশেষ প্রতিনিধি জামির কাবুলভ জানিয়েছেন, চুক্তির মূল ফোকাস মূলত আফগানিস্তানের কাছে থাকা পুরোনো রুশ সামরিক সরঞ্জামগুলোর মেরামত ও সচল করার ওপর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উল্লেখ্য, ৮০'র দশকে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় আফগানিস্তানের ততকালীন সরকারকে বিপুল পরিমাণ হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও কামান সরবরাহ করেছিল মস্কো। দীর্ঘদিন পড়ে থাকা সেইসব অস্ত্রের এখন জরুরি মেরামত ও খুচরা যন্ত্রাংশ প্রয়োজন।

আঞ্চলিক প্রভাব

সংবাদ মাধ্যম নিক্কেই এশিয়াকে একজন আঞ্চলিক কূটনীতিক বলেন, তালেবান প্রশাসনের সঙ্গে রাশিয়ার এই সামরিক চুক্তিটি একটি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের সূচনা। ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশও কাবুলের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি করতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমানে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে তলানিতে ঠেকেছে। গত বছরের অক্টোবরে আফগান সীমান্তে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এর ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। এর জবাবে সীমান্ত সংঘর্ষ ও বাণিজ্য অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান বরাবরই অভিযোগ করে আসছে যে তালেবান টিটিপি জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, অন্যদিকে আফগানিস্তান একে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে।

মস্কো থেকে ফিরে মোল্লা ইয়াকুব আফগান গণমাধ্যমকে বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি কার্যকর হলে পাকিস্তান আর আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালানোর সাহস পাবে না। তার এই বক্তব্য ইঙ্গিত করে যে, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর হামলা ঠেকাতে কাবুল হয়তো রাশিয়ার কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার আশা করছে।

পাকিস্তানের অবস্থান

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, তারা এই চুক্তি নিয়ে একেবারেই চিন্তিত নন। এক কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি আফগানিস্তানকে এমন কোনো শক্তি দেবে না যা দিয়ে তারা ভবিষ্যতে সন্ত্রাসী আস্তানায় পাকিস্তানের সম্ভাব্য বিমান হামলা ঠেকাতে পারে।

ইসলামাবাদের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহকারী অধ্যাপক গুল-ই-আয়েশা ভাট্টি বলেন, এই চুক্তিটি মূলত প্রতীকী। আফগানিস্তান বিমান হামলা ঠেকানোর জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেতে আগ্রহী হলেও রাশিয়া তা সরবরাহ করবে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। কারণ রাশিয়া নিজেই বর্তমানে ড্রোন হামলার মুখে রয়েছে এবং তাদের নিজেদেরই এ ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বের কোনো পরাশক্তিরই এখন তালেবানকে দেওয়ার মতো উদ্বৃত্ত সামরিক সক্ষমতা নেই।

অন্য এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, এই চুক্তি ঠেকাতে পাকিস্তান কোনো কূটনৈতিক তৎপরতাও চালাচ্ছে না, কারণ তারা একে হুমকি মনে করে না।

বিশেষজ্ঞ মতামত

ইসলামাবাদভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল ফর রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স'-এর প্রেসিডেন্ট ইসরার মাদনি মনে করেন, রাশিয়ার এই সম্পৃক্ততা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ভালো হতে পারে। তিনি বলেন, আফগানিস্তানে সক্রিয় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো শুধু পাকিস্তানের নয়, রাশিয়ার জন্যও উদ্বেগের কারণ। আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে কাবুলের এ যোগাযোগ বরং আফগানিস্তানের ওপর সন্ত্রাসবাদ দমনের চাপ আরও বাড়াবে।

সূত্র: নিক্কেই এশিয়া