পদ্মা ও টাঙ্গুয়ায় দুর্লভ বকের সন্ধান: ধূসর ও বেগুনি বকের অদ্ভুত ভঙ্গি
পদ্মা ও টাঙ্গুয়ায় দুর্লভ বকের সন্ধান: ধূসর ও বেগুনি বকের অদ্ভুত ভঙ্গি

রাজশাহীর পদ্মা নদীর চরে অদ্ভুত ভঙ্গিতে একটি ধূসর বক দেখা যায়। লেখক ১০ বছর আগের দুটি ঘটনা স্মরণ করেছেন। প্রথম ঘটনাটি ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারির। পাখির খোঁজে জিল্লাল মাঝির নৌকায় রাজশাহীর পদ্মায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন লেখক। পুলিশ লাইনসের বটতলা ঘাট থেকে যাত্রা করে এক ঘণ্টায় বুলনপুর ও হারুপুর পার হন। নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নবগঙ্গার কাছাকাছি আসতেই ২৫-৩০টি বড় পানকৌড়ি ও ১০-১২টি ধূসর বর্ণের বড় বকের দেখা মেলে।

ধূসর বকের অদ্ভুত ভঙ্গি

বকগুলোর পাশে ডানা অর্ধচন্দ্রাকৃতির মতো করে অদ্ভুতভাবে কিছু একটা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। নৌকা বকের কাছাকাছি আসতেই ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে দ্রুত শাটারে ক্লিক করেন লেখক। আসলে ওটা ছিল বড় বকগুলোরই একটি। তবে ডানা পিছমোড়া করে ফুলিয়ে যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, তাতে দূর থেকে কোনোভাবেই বোঝার উপায় ছিল না যে সেটিও একটি পাখি।

টাঙ্গুয়ার হাওরে বেগুনি বক

পরের ঘটনায় যাওয়া যাক। সাতজনের একটি দল নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে শীতের পরিযায়ী পাখি পর্যবেক্ষণে এসেছিলেন লেখক। দুই দিন ধরে হাওরের বিভিন্ন বিল ও কন্দায় (বিলের মধ্যে উঁচু স্থান) ঘুরে প্রচুর পাখি দেখা হয়। দ্বিতীয় দিন (২৩ জানুয়ারি ২০১৬) চটাইন্যা ও লেচুয়ামারা বিলে পাখি দেখা শেষে ফিরতি পথ ধরেন তারা। রউয়া বিলে ঢোকার সঙ্গেই একটি জলাঝোপে লম্বা চঞ্চুর বেগুনি বর্ণের বড় একটি বককে শিকারের অপেক্ষায় টান টানভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। লম্বা ঘাস ও ঝোপের মধ্যে সে নিজেকে এমনভাবে আড়াল করে রেখেছিল যে পালকের রং ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল না। তবে লেখক ঠিকই চিনতে পারেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দুই প্রজাতির বক

এতক্ষণ রাজশাহীর পদ্মা ও সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে দেখা যে দুটি জলচর পাখির গল্প বলা হলো, ওরা এ দেশে পাওয়া তিন ধরনের বকের একটি, যারা হেরন (বক) নামে পরিচিত। প্রথম গল্পের ডানা পিছমোড়া করে দাঁড়িয়ে থাকা বকটি এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি—ধূসর, ধূপনি বা ডাইং বক। খাইরা, পিদালি, কালি কাক, কাক, সাদা কাক (পশ্চিমবঙ্গ), শীতলে কাক বা নল কাক নামেও পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম Ardea cinerea। প্রাপ্তবয়স্ক ধূসর বকের দৈর্ঘ্য ৮৪ থেকে ১০২ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১ হাজার ২০ থেকে ২ হাজার ৮০ গ্রাম।

দ্বিতীয় গল্পের অর্থাৎ টাঙ্গুয়ার হাওরের রউয়া বিলের জলাঝোপে আত্মগোপনকারী বকটি এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি বেগুনি বক। ওইক্কা, ঝুঁটি, চুনি বক, খয়রাকানা বা লাল কাক (পশ্চিমবঙ্গ) নামেও পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম Ardea purpurea। আকার ও ওজনে বেগুনি বক ধূসর বকের থেকে ছোট। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য ৭৮ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৫২৫ থেকে ১ হাজার ৩৪৫ গ্রাম।

আবাস ও আচরণ

দুই প্রজাতিকেই পুরো দেশের অগভীর হাওর, বিল, হ্রদ, নদী, খাল, জলাভূমি, আবাদি জমি, পুকুর, মোহনা প্রভৃতি স্থানে দেখা যায়। ধূসর বক সচরাচর একা বা ছোট দলে পানি, কাদা, চর বা মাঠে এবং বেগুনি বক জলাঝোপ বা ভাসমান উদ্ভিদে ভরা অগভীর পানিতে একা বিচরণ করে।

প্রজনন ও আয়ুষ্কাল

প্রজাতিভেদে জুন থেকে অক্টোবর এদের প্রজননকাল। প্রজাতিভেদে ২ থেকে ৬টি নীলচে সবুজ রঙের ডিম পাড়ে, যা ২৫ থেকে ২৮ দিনে ফোটে। স্ত্রী-পুরুষ পালাক্রমে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের যত্ন নেয়। ছানারা ৪৫ থেকে ৫০ দিনে উড়তে শেখে। তবে পুরোপুরি স্বাবলম্বী হতে ৯ থেকে ১০ সপ্তাহ লাগে। উভয়ের আয়ুষ্কাল ১০ বছরের বেশি।

আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।