যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সদর দপ্তরে মে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে অত্যন্ত গোপনে ও আকস্মিকভাবে সফর করেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ জেনারেল। তাঁর এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জোরপূর্বক দখল করতে দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর স্থল অভিযানের পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে অবহিত হওয়া।
বিষয়টির সঙ্গে জানাশোনা রয়েছে এমন দুটি সূত্র যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ছিলেন বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে। সেখানে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ছিল। কিন্তু গত ১৯ মে ফ্লোরিডার টাম্পায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক এতটাই জরুরি ও সংবেদনশীল ছিল যে জেনারেল কেইনকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে দ্রুত সেখানে আসতে হয়েছিল বলে জানান সূত্র দুটি।
উচ্চপর্যায়ের ব্রিফিং
সূত্র আরও জানিয়েছে, উচ্চপর্যায়ের ও জরুরি এ ব্রিফিং এটাই স্পষ্ট করে যে মার্কিন প্রশাসন ইরানে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্থল অভিযান অনুমোদন দেওয়ার কতটা কাছাকাছি চলে এসেছিল। ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়ে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ওই দুই সূত্রের একজন সিএনএনকে জানিয়েছেন, ফ্লোরিডার বৈঠকের পরপর জেনারেল কেইন ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিকল্পগুলো সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবহিত করেছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিকল্পনাটি আটকে দেন।
চুক্তির দোরগোড়ায় ট্রাম্প
সম্ভাব্য এ স্থল অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ট্রাম্প বারবার বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তির দোরগোড়ায় রয়েছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করছে। সর্বশেষ ট্রাম্প বলেছেন, আজ (১৪ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চুক্তি সই হতে পারে।
এ বিষয়ে সূত্রগুলো জানিয়েছে, এমন অভিযান চালানো হলে ইরান কঠোর প্রতিশোধ নিতে পারে বলে ট্রাম্প সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। এই পরিস্থিতি চলমান যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। সেই সঙ্গে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলতে পারে। সম্ভাব্য এসব পরিস্থিতি ও সতর্কবার্তা বিবেচনায় নিয়ে ট্রাম্প অভিযানের পথ থেকে সরে আসেন।
বিষয়টির সঙ্গে জানাশোনা রয়েছে এমন সূত্র জানায়, ইরানে স্থল অভিযান চালালে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা হতাহত হতে পারেন, এমন শঙ্কাও বিবেচনায় নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
ইরানের পাল্টা পরিকল্পনা
স্থল অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়ে জানেন এমন একটি সূত্র জানায়, গত মাসে ট্রাম্প যে পরিকল্পনাটিতে সায় দেননি, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘অনেক ঝুঁকি’ রয়েছে।
যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে, তাহলে তেহরানের পক্ষ থেকেও অর্থনৈতিক ‘পারমাণবিক বিকল্পের’ পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিষয়টির সঙ্গে জানাশোনা রয়েছে এমন তিনটি সূত্র সিএনএনকে এ কথা জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, ইরানের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের হুতিদের দিয়ে বাব–এল–মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। হরমুজ প্রণালির মতো এটাও বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। তবে হরমুজের তুলনায় বেশ সংকীর্ণ। ইরানের মাসব্যাপী হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার সময়ে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের পথ হিসেবে এটি ভূমিকা রেখেছে।
ইউরেনিয়াম দখলের সম্ভাবনা
ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো জোরপূর্বক ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল করতে পারে। তবে তিনি এমন কোনো অভিযান নিয়ে এগোতে ইচ্ছুক নন, যা বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনার প্রাণহানির কারণ হতে পারে। মার্কিন নাগরিকেরা এ অভিযান সমর্থন করবেন কি না, এ নিয়েও সন্দিহান তিনি।
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলোর একটি হলো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ‘সুরক্ষা নিশ্চিত’ করা। আলোচনা কিংবা সামরিক, কোনো উপায়েই এ লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি ওয়াশিংটন।
ফক্স নিউজে গত বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেখানে ইরানের প্রধান তেলকেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপের’ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন তিনি। সম্ভাব্য এই অভিযানেও ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আসলেই জানি না, আমেরিকার সেই তেজ আছে কি না।’
যদিও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য সম্ভাব্য অভিযানের বিষয়টি পুরোপুরি খারিজ করে দেননি ট্রাম্প। দাবি করা হয়ে থাকে, ইরান ৯৭০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম অস্ত্রের প্রায় সমপর্যায়ে সমৃদ্ধ করেছে।
ইরানের গড়িমসি
তবে ইরান এমন একটি চুক্তি করা নিয়ে গড়িমসি করছে, যেটায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য ছাড় দেওয়ার কথা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে স্বেচ্ছায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করার বিষয়টিও রয়েছে। সিএনএনকে সূত্রটি জানিয়েছে, এসব মজুত ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায়, প্রধানত ইস্পাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদো পারমাণবিক কেন্দ্রে ছড়িয়ে রয়েছে এবং সুড়ঙ্গের গভীরে পুঁতে রাখা হয়েছে।
পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক অভিযানের সময় ইরানের লুকানো ইউরেনিয়ামের পুরোটা মার্কিন বাহিনী খুঁজে পাবে কি না, যাচাই করতে পারবে কি না, প্রতিকূল পরিবেশে সেসব পুরোপুরি নিরাপদে অপসারণ করতে পারবে কি না—এসব নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। সিএনএন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের এসব ইউরেনিয়াম গ্যাসীয় অবস্থায় আছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২৫ সালের জুনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সর্বশেষ পরিদর্শনের সময় সেটা জানা গেছে।
নিজেদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান আইএইএর পরিদর্শন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। হামলায় এসব কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক উপাদানগুলো ধ্বংস করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে সিএনএন।
আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এখনকার ইউরেনিয়ামের মজুত দিয়ে ১০টি বোমা বানিয়ে ফেলতে পারবে।
তবে সূত্র দুটি আরও জানিয়েছে, ইরানের সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুত কোথাও আছে সেটা জানার বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দারা আত্মবিশ্বাসী। আর এ আত্মবিশ্বাসের কারণ, আকাশপথে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি।
ইরানের জবাবের ঝুঁকি
মার্কিন বাহিনীর স্থল অভিযানের জবাবে ইরান বাব–এল–মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছেন গোয়েন্দারা। এতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি রয়েছে। এর জেরে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে পারে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের সাম্প্রতিক সতর্কতার বিষয়ে জানেন এমন একটি সূত্র সিএনএনকে বলে, এটা লক্ষ করতে হবে, হুতিরা মার্কিন কিংবা ইউরোপীয় কোনো জাহাজে এখনো বড় ধরনের হামলা চালায়নি। তবে হুতিরা বলেছে, তারা ইসরায়েলের পতাকাবাহী বা ইসরায়েলি মালিকানাধীন যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
এ বিষয়ে সূত্রটি জানিয়েছে, ইসরায়েলি জাহাজের বাইরে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর পরিধি বাড়ানো হলে, তা একটি গুরুতর উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তাদের মতে, ইরানিরা এখন পর্যন্ত হুতিদের এমন পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে রাজি করানো থেকে বিরত থেকেছে। কারণ, ইরান ভালোভাবে জানে, এটা চলমান শান্তি আলোচনাকে ব্যাহত করতে পারে।
যদি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো না যায় এবং ট্রাম্প সতর্ক থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন ইরানও এই কৌশলগত ‘কার্ডটি’ খেলতে পারে।
জেনারেল কেইন ও অন্য সামরিক কমান্ডাররা এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘায়িত সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা, জটিলতা ও সম্ভাব্য মার্কিন হতাহতের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি ও পেন্টাগনের অনেকে সতর্ক করেছিলেন, এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেটা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত ও সামরিক প্রস্তুতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।



