এক মাসেরও কম সময় আগে পারস্য উপসাগরে শান্তির যে আলো উঁকি দিচ্ছিল, সেই আলো পুনরায় সংঘাতের কালো মেঘে ঢেকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সাত দিনব্যাপী শেষযাত্রার আয়োজন চলাকালেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়া শুরু হয়েছে।
হামলা ও পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতা
চলতি মাসের ৭ এবং ৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে; জবাবে ইরান পারস্য উপসাগর অঞ্চলের কয়েকটি আরব দেশে আমেরিকার সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। পরিস্থিতি অশান্ত হওয়ার মূলে রয়েছে সরু, মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রস্থ হরমুজ প্রণালি—যা একদিকে ইরান অন্যদিকে ওমানের উপকূল ঘেঁষে পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েই চলছে উপসাগরীয় যুদ্ধের নতুন অধ্যায়।
তবে যুদ্ধের জন্য হরমুজ প্রণালি বা তার ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে দায়ী করা ভুল হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল বিনা উসকানিতে ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যে যুদ্ধ শুরু করে, তার ফলশ্রুতিতেই ইরান এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়।
কৌশলগত বিপর্যয় ও সমঝোতার প্রচেষ্টা
বিশ্ববাণিজ্য, বিশেষ করে উপসাগর অঞ্চল থেকে তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল কৌশলগত এক বিপর্যয়। গত কয়েকদিনের ঘটনাবলি দেখে মনে হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য হরমুজ প্রণালিকে ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার রাস্তা খুঁজছেন।
গত ৮ এপ্রিল ইরান আর যুক্তরাষ্ট্র সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হবার পর থেকে প্রণালিতে জাহাজের ওপর ইরানের হামলা এবং জবাবে ইরানের সামরিক স্থাপনার ওপর আমেরিকান হামলার ঘটনা মাঝে-মধ্যেই হয়েছে। কিন্তু সব সময়ই একটা ধারণা ছিল যে, সহিংসতা সীমিত থাকবে এবং পরিস্থিতি কোনোভাবেই মার্চ মাসের সার্বিক যুদ্ধে ফিরে যাবে না।
এই আস্থা আরও গভীর হয় জুন মাসের ১৭ তারিখ, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এই স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি আরও দুমাস বাড়ানো হয় এবং একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু ঠিক করা হয়।
অবিশ্বাস ও উত্তেজনা বৃদ্ধি
কিন্তু এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও দুপক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস আর আস্থাহীনতা প্রবলভাবে বিরাজ করছে। যে কারণে এ সপ্তাহের হামলা আর পাল্টা হামলা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই আশঙ্কা সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথায় আরও জোরদার হয়েছে। তিনি তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ বলেও মন্তব্য করেন। “আমার মনে হয় শেষ,” ট্রাম্প সোমবার (৬ জুলাই) যুদ্ধবিরতি নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেন এবং তারপরই ইরানের নেতাদের লক্ষ্য করে গালিগালাজ শুরু করে দেন। “আমি তাদের সঙ্গে আর কাজ করতে চাই না, তারা আবর্জনা। আপনি জানেন আবর্জনা কী? তারা আবর্জনা। তারা অসুস্থ, নোংরা মানুষ। এবং তারা হিংস্র, সহিংস লোক,” ট্রাম্প বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এই ধরনের বক্তব্যের পর ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা অনেকের মনে সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেকে এটা ট্রাম্পের অভ্যাসগত আচরণ হিসেবে উড়িয়ে দিতে চান।
হরমুজ প্রণালি: অস্ত্রে পরিণত
ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সমঝোতা স্মারকে বলা ছিল যে ইরান সাধ্যমতো চেষ্টা করবে কোনও টোল ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ৬০ দিনের মধ্যে নিশ্চিত করতে। কিন্তু ইরান যেহেতু প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দাবি করে, তাই তারা নির্দেশ দিয়েছে জাহাজগুলো যেন তাদের নির্ধারিত চ্যানেল দিয়ে, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে যাতায়াত করে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান লক্ষ্যগুলোর মূলে আছে, তেলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটানো। সে লক্ষ্যে তারা নতুন এক কৌশল হাতে নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের সহায়তায় ওমানের উপকূল ঘেঁষে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার একটি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ইরান এই নতুন চ্যানেল প্রতিষ্ঠাকে সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন বলে গণ্য করছে।
জুলাই মাসের ৬ এবং ৭ তারিখে প্রণালিতে তিনটি জাহাজের ওপর ড্রোন হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে দেশের উপকূলে বেশ কয়েকটি স্থানে বোমাবর্ষণ করেছে। ইতোমধ্যে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন হরমুজের দুপাশে আটকে পড়া জাহাজের মালিকদের প্রণালি অতিক্রম না করার পরামর্শ দিয়েছে। অর্থাৎ, কয়েক দফা হামলার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ চলাচল আবার প্রায় বন্ধ।
যুদ্ধের প্রভাব ও ট্রাম্পের চ্যালেঞ্জ
চল্লিশ দিনের যুদ্ধে ট্রাম্প তার মূল লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে শুধু ব্যর্থ হননি, যুদ্ধের কারণে ইরান তাদের সবচেয়ে ভয়ানক ‘অস্ত্র’ আবিষ্কার এবং সেটা ব্যবহার করার সুযোগ পায়, আর তা হলো হরমুজ প্রণালির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী, শেয়ার বাজারে অস্থিরতা এবং বিশ্ববাণিজ্যে মন্দাভাব সৃষ্টি হয়। আমেরিকায় পেট্রোলের (তাদের ভাষায় গ্যাস) দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে শুরু করে। ইরান যুদ্ধ ঘিরে অসন্তোষের কারণে, মাত্র চার মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনে সংসদের দুইকক্ষেই ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সমঝোতা স্মারকের ভবিষ্যৎ
সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অনেক দাবিই মেনে নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে অনেকেই, বিশেষ করে যাদের ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক—তারা চান ট্রাম্প যেন এই স্মারক বাস্তবায়ন না করেন। ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বের হতে চাচ্ছেন, কিন্তু একটা কিছু ‘অর্জন’ তার প্রয়োজন, যাতে তিনি ‘বিজয়’ ঘোষণা করতে পারেন।
তিনি ইরানে ইসলামি সরকারের পতন ঘটানোর আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণশিল্প ধ্বংস করার কথাও আর বলছেন না। তিনি চান, ইরান পারমাণবিক কার্যক্রম চিরতরে বন্ধ করে দিক। কিন্তু হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যতদিন ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ততদিন তেহরান পারমাণবিক বিষয়ে আপস করতে রাজি হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের কৌশল ও ইরানের প্রতিরোধ
ট্রাম্পের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জই হচ্ছে ইরানের হাত থেকে ‘হরমুজ-অস্ত্র’ ছিনিয়ে নেওয়া এবং সমঝোতা স্মারক সই করার পর থেকে সেটাই যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান আমেরিকার এই কৌশল প্রতিরোধ করার জন্য উপসাগর অঞ্চলে অবস্থিত আমেরিকান স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। কিন্তু তেহরানের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি ভয়ানক বিপদ নিয়ে আসতে পারে।
যখনই কোনও জাহাজ ইরানের নির্ধারিত চ্যানেল ব্যবহার না করে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ওমানের উপকূল ঘেঁষে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখনই ইরান হামলা চালিয়ে সবাইকে এই পথ নেওয়া থেকে নিবৃত থাকার বার্তা দেয়। প্রতিটি জাহাজের ওপর হামলা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইরানের ওপর আরও কয়েকগুণ বেশি ক্ষতিকর আক্রমণ চালানোর অজুহাত তুলে দেয়। অন্যদিকে, ইরান যদি হামলা চালিয়ে ওমান উপকূল ঘেঁষে জাহাজ চলাচল নিবৃত না করে, তাহলে খুব দ্রুত তারা প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। তারা হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, তাদের ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন, ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ছোট স্পিড বোট বহর, আর প্রণালির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন নিক্ষেপকারী অবকাঠামো লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ চালাচ্ছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, তারা ধীরে ধীরে প্রণালিতে জাহাজের ওপর হামলা চালাতে ইরানের সক্ষমতা ধ্বংস, অথবা সীমিত করে ফেলতে পারবে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির ওপর আগের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেছে, যেটা সমঝোতা স্মারকের আরেকটি লঙ্ঘন। ফলে, সামরিক এবং অর্থনৈতিক—দুই চাপ অব্যাহত থাকবে।
ইরানের সীমিত বিকল্প
ইরানের পক্ষে এই নিম্নমাত্রার সহিংসতা বজায় রাখা সহজ হবে না। পাল্টা হামলার জন্য তারা আমেরিকান নৌবহরের কোনও জাহাজ বেছে নিলে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কোনও ধরনের জবাব না দিলে ইরানের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস কমে যাবে। ইরান পাল্টা হামলার জন্য ছোট আরব দেশগুলোতে অবস্থিত আমেরিকান স্থাপনা বেছে নিয়েছে। কিন্তু সেই আক্রমণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
ইরান চাইবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে একটি নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে, যেখানে আমেরিকা বা ইসরায়েলের কোনও ভূমিকা থাকবে না। কিন্তু ইরান যতদিন এই দেশগুলোর ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখবে, ততদিন রাজনৈতিক সমঝোতার পথ সহজ হবে না।
এই মুহূর্তে, হামলার মাত্রা এবং পরিধি বাড়ানোর ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে। সেদিক থেকে ইরানের হাতে অপশন অনেক কম। কিন্তু যতদিন ইরান ক্রমবৃদ্ধিমান আমেরিকান হামলার ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে পারবে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে, ততদিন ট্রাম্প তার কাঙ্ক্ষিত ‘বিজয়’ ঘোষণা করতে পারবেন না।



