কাতারের আল-শাহানিয়া এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হয়েছেন। নিহতরা সবাই সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা। তাদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। একেকটি পরিবারের শোকগাথা হৃদয়বিদারক। পিতার মৃত্যুর ১৪ বছর পর একই দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় পুত্রের মৃত্যুর ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
নিহত জুবের আহমদের পরিবারের বেদনা
নিহত জুবের আহমদের মা জাহানারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, চার বছর আগে তার ছেলে কাতারে যান। তার স্ত্রী ও চার বছরের একটি সন্তান রয়েছে। ১৪ বছর আগে জুবেরের পিতা প্রবাসে দুর্ঘটনায় মারা যান। এখন একইভাবে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হয়েছে তার ছেলে জুবেরকেও।
কাদির আহমদের পরিবারের আকুতি
নিহত কাদির আহমদের পিতা বাহার উদ্দিন জানান, চার বছর আগে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে তার ছেলে কাতারে পাড়ি জমান। আগামী মাসে কাদিরের দেশে ফেরার কথা ছিল। কাদির আহমদসহ অপর চারজনই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তারা কাতারের একটি মাজরায় কাজ করতেন।
জসিম উদ্দিনের স্ত্রীর অনিশ্চয়তা
নিহত জসিম উদ্দিনের স্ত্রী শাহিনা বেগম বলেন, তিন বছর আগে জীবিকার তাগিদে তার স্বামী কাতারে যান। পরিবারের সবাই তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুতে দুই শিশু সন্তান নিয়ে তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত শাহিনা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তার আশ্বাস
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান শাকিল বলেন, ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর তিনি সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের ফোন করে নিহতদের পরিবারের খোঁজখবর নিতে বলেছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
ইউপি চেয়ারম্যানদের বক্তব্য
স্থানীয় ঝিঙ্গাবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আবু বক্কর জানান, কাতারের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচ প্রবাসীর মধ্যে চারজনের বাড়ি তার ইউনিয়নে। নিহতদের পারিবারিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এসব পরিবারের প্রতি সরকারের সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার দাবি জানান তিনি। দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার লোকমান আহমদ বলেন, নিহতরা তার এলাকার বাসিন্দা। এর মধ্যে কাদির আহমদের বাড়ি তার ইউনিয়নে। তিনি কাদিরের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন।
দুর্ঘটনার বিবরণ
গত রবিবার (২১ জুন) বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টায় কাতারের রাজধানী দোহা থেকে আল-শাহানিয়া শহরে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে একটি প্রাইভেট ট্যাক্সি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই চালকসহ কানাইঘাটের পাঁচ কাতারপ্রবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। গাড়ির চালক ভারতীয় হওয়ায় তার পরিচয় জানা যায়নি। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় মরদেহগুলো উদ্ধার করে কাতারের একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
নিহতদের পরিচয়
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নুরের ছেলে জিবাল আহমদ (৩৫), মাঝতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন (৩৮), আগতালুক গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে মস্তাক আহমদ (২৭), একই গ্রামের মড়া মিয়ার ছেলে জুবের আহমদ (২৮) এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ি গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদির আহমদ (৩৩)। নিহতদের মধ্যে জসিম উদ্দিন ও জুবের আহমদ বিবাহিত। অপর তিনজন অবিবাহিত।
সরকারের পদক্ষেপ
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এক শোকবার্তায় মন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা আমাদের এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। মন্ত্রী আরও জানান, কাতারস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।



