যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে। একতরফা বাণিজ্য সুবিধা বা সহায়তার পরিবর্তে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগকেই এখন অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন। এই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যিক কূটনীতিকে সামনে রেখে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।
রোববার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচ্যাম) নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে এ কথা জানান তিনি। অ্যামচ্যামের নবনির্বাচিত নির্বাহী কমিটির সভাপতি মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, সহ-সভাপতি মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমদ। এছাড়া কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা উর রহমান মাহমুদ। ২০২৬–২০২৮ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন তারা।
রাষ্ট্রদূত বলেন, আমেরিকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বমানের সেরা চর্চা নিয়ে বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করে এবং সেই বাজারের কাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু বিনিয়োগই করে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলে এবং নিয়মিত কর পরিশোধের মাধ্যমে অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখে। ফলে যেখানে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেখানে একটি স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে ওঠে।
রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, অ্যামচ্যাম যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এই সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে আসছে। নবগঠিত নির্বাহী কমিটিও সেই ধারাবাহিকতাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার এখন বাণিজ্যিক কূটনীতি। এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এমন একটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো, যেখানে কোনো একতরফা সুবিধা বা সুরক্ষাবাদ থাকবে না; বরং ন্যায্যতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের সম্ভাবনার প্রতি একটি আস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, বাংলাদেশ দ্রুত বিকাশমান একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে এবং বৈশ্বিক সম্পদ সৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠতে সক্ষম।
রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় তাদের আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে। একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার এই প্রক্রিয়ায় দেশীয় ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সকলকে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে একটি আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি এই নতুন কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই ধরনের চুক্তি শুধু বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়াবে না, বরং উভয় দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং সুরক্ষাবাদী নীতির বাধা দূর করতে না পারলে এই সম্ভাবনা পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে পারলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারে পরিণত হতে পারে।
অ্যামচামের নতুন সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, সংগঠনটির প্রায় ২৫০ সদস্য রয়েছে, যারা দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই সদস্যদের মধ্যে শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা এবং বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
তিনি জানান, বর্তমান নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ২২০ বছরের বেশি, যা সংগঠনটিকে আগামী দিনে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। এই দলটি অর্থনীতি, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য, উৎপাদন ও লজিস্টিকসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিত্ব করছে।
নতুন নেতৃত্বের অধীনে সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে জোর দেবে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতেও কাজ করবে আমচ্যাম।



