তিস্তা প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহায়তা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
তিস্তা প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহায়তা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

চীন তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনায় সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এ প্রকল্পে বেইজিংয়ের নতুন করে সক্রিয় আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুললেও, বাস্তবায়নের পথে ভারতের অবস্থান ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

চীনের সহায়তার প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে মহাপরিকল্পনার শুরু থেকে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে কারিগরি সহায়তা দিতে চেয়েছে চীন। অর্থাৎ সমীক্ষা, প্রকল্পের ডিজাইন, বাস্তবায়ন—প্রতিটি ধাপেই যুক্ত হতে আগ্রহী চীন।

দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্প

অনেক বছর ধরেই তিস্তার ব্যবস্থাপনার প্রকল্পটি ঝুলে রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময় চীন সমীক্ষার কিছুটা কাজও করেছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে আওয়ামী লীগ সরকার চীনের সঙ্গে এ নিয়ে আর এগোয়নি। অন্যদিকে, তিস্তার পানিবণ্টন প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে চুক্তি অধরাই রয়ে গেছে। বছরের পর বছর বাংলাদেশ এই চুক্তির জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এমনকি দশ বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চুক্তিটি সই হতে যাচ্ছে, এমন ধারণা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। সে সময় ভারত সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কথা কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিল।

পানিবণ্টন চুক্তির প্রয়োজনীয়তা

বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টনের চুক্তি করা দরকার, সেটিও একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। তবে এখন বিএনপি সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হচ্ছে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন। সরকার গঠনের পরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তার সরকারের অগ্রাধিকারের কথা বলেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য

বৃহস্পতিবার ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ঢাকার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরাঞ্চলের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তিস্তার বৃহদায়তন প্রকল্পে চীন এগিয়ে এসেছে। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয় চীনের বিবেচনায় নেই।

তিস্তার ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট

ভারত থেকে বাংলাদেশে যে ৫৪টি নদী প্রবেশ করেছে, তার একটি তিস্তা ভারতের সোলামো লেক থেকে উৎপন্ন হওয়ার পর সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রংপুর জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পরে এটি কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারির কাছে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

প্রকল্পের সম্ভাব্য সুবিধা

কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটিতে তিস্তার উপকূল ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নানা অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানি সংকট দূর করতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হতে পারে। এটা করা সম্ভব হলে রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার কৃষি উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। রংপুর অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং নদীভাঙন কমবে। একই সঙ্গে নদীকেন্দ্রিক শিল্প ও পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়বে।

ভূমি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা

তারা উল্লেখ করেন, তিস্তার বিস্তৃতি কোনো এলাকায় পাঁচ কিলোমিটার, কোথাও দেড় কিলোমিটার বা কোথাও তিন কিলোমিটার আছে। সেক্ষেত্রে গভীরতা বাড়িয়ে চওড়া বা বিস্তৃতি কমিয়ে দেড় বা দুই কিলোমিটার করা হতে পারে। এর ফলে তিস্তার পারে থাকা শত শত একর জমি বা ভূমি পুনরুদ্ধার হবে, যা ভূমিহীন মানুষ কিংবা শিল্পায়নের কাজে লাগানো যাবে।

ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

বিএনপি সরকার তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নকে যেমন অগ্রাধিকার দিচ্ছে, চীনও জোরালো আগ্রহ দেখাচ্ছে এই প্রকল্পে সহায়তার জন্য। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে বাংলাদেশকে কৌশলে এগোতে হবে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমানের প্রথম সফর ছিল মালয়েশিয়া। সেখান থেকেই চীনে গিয়েছিলেন তিনি। চীনে এই সফরে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোর এবং তিস্তা প্রকল্পের বিষয়কেই স্পর্শকাতর হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

হুমায়ুন কবির বলছেন, এই দুটি বিষয়ের ক্ষেত্রে মূলত ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করতে হবে—চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বনাম ভারত। এর পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো আঞ্চলিক সমীকরণও রয়েছে। এই বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে সহযোগিতায় রূপান্তর করতে পারবে, তার ওপরই সম্ভাব্য এই প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।