২০১৬ সালের ১ জুলাই ছিল শুক্রবার। সন্ধ্যার পর ঢাকার গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। ইফতারের পর কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র হাতে কয়েকজন তরুণ রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ে। শুরু হয় জিম্মি সংকট। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। এরপর র্যাব, সোয়াট, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন।
প্রথম দফায় উদ্ধারতৎপরতা ও হতাহত
প্রথম দফায় জিম্মিদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে হামলাকারীদের বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান। পরে তাঁরা মারা যান। আহত হন আরও অনেকে। রাতভর গুলশানের রাস্তায় অপেক্ষা করেন জিম্মিদের স্বজনেরা। কেউ জানতে পারছিলেন না, ভেতরে তাঁদের প্রিয়জনেরা বেঁচে আছেন কি না।
অপারেশন থান্ডারবোল্ট ও উদ্ধার
পরদিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। সাঁজোয়া যান দিয়ে রেস্তোরাঁর দেয়াল ভেঙে কমান্ডোরা ভেতরে ঢোকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযান শেষ হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জনকে। কিন্তু তারপরই স্পষ্ট হয় হামলার ভয়াবহতা। রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ২০ জিম্মির লাশ। তাঁদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি। পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ ওই হামলায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২।
নিহতদের পরিচয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের ফারাজ হোসেন, অবিন্তা কবির ও ইশরাত আখন্দ। ছিলেন ভারতীয় তরুণী তারিশি জৈন। ছিলেন ইতালির নাগরিক ক্লাউদিয়া কাপেল্লি, ভিনচেনসো দালেস্ত্রো, মার্কো তোন্দাৎ, নাদিয়া বেনেদিত্তি, সিমোনা মন্তি, ক্রিস্তিয়ান রসি, মারিয়া রিবোলি, আদেলে পুলিজি ও ক্লাউদিয়া দান্তোনা। ছিলেন জাপানের নাগরিক ওকামুরা মাকাতো, কোয়ো ওগাসাওয়ারা, হাসিমাতো হিদেকো, তানাকা হিরোশি, সাকাই ইউকু, শিমুধুইরা রুই ও কুরুসাকি নুবুহিরি। সাত জাপানি নাগরিক বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতা-সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত ছিলেন। ইতালীয় নাগরিকদের মৃত্যু ইউরোপীয় মহলে গভীর শোক ও উদ্বেগ তৈরি করে। কূটনৈতিক এলাকা গুলশানে বিদেশিদের লক্ষ্য করে এমন হামলা বাংলাদেশের নিরাপত্তা-ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিকভাবে নাড়িয়ে দেয়।
হামলার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি
হোলি আর্টিজানে হামলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল কয়েক মাস আগে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আইএস মতাদর্শী গোষ্ঠীটির কথিত শুরা কমিটি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া এলাকায় বৈঠক করে ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় বড় হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। বৈঠকে এই গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সংগঠক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী বিদেশিদের ওপর হামলার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়, হামলার মূল সমন্বয়ক হবেন তামিম। সহ–সমন্বয়কের দায়িত্ব পান নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান। লজিস্টিক সহায়তায় যুক্ত হন বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট, তানভীর কাদেরীসহ কয়েকজন।
হামলাকারী তরুণদের পটভূমি
হামলার জন্য বেছে নেওয়া হয় পাঁচ তরুণকে। তাঁদের মধ্যে তিনজন ঢাকার সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তান—রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের। রোহান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। সামেহ মোবাশ্বের স্কলাসটিকা থেকে ও লেভেল পাস করেছিলেন। নিবরাস ঢাকার টার্কিশ হোপ স্কুল ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন বগুড়ার খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল। হোলি আর্টিজান দেখায়, ইংরেজি মাধ্যম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সচ্ছল পরিবার, নগরজীবন—কোনোটিই উগ্রবাদী মতাদর্শ থেকে স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা দেয় না।
হামলার ঘটনাক্রম ও অভিযান
হামলার আগে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করা হয়। সেখানে জুনের শুরু থেকে ধাপে ধাপে ওঠেন তানভীর কাদেরী, বাশারুজ্জামান, মারজান, তামিম চৌধুরী এবং পাঁচ হামলাকারী। হামলার দিন ১ জুলাই বিকেলের দিকে দুই ভাগে ভাগ হয়ে পাঁচ হামলাকারী বসুন্ধরার বাসা থেকে বের হন। কিছু পথ রিকশায়, কিছু পথ হেঁটে তাঁরা গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে পৌঁছান। ইফতারের পর শুরু হয় হামলা। রাতেই একে একে ২০ জনকে হত্যা করা হয়।
আইএসের দায় স্বীকার ও সরকারের ভাষ্য
হামলা চলাকালেই ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস ঘটনার দায় স্বীকার করে। আইএসের কথিত বার্তা সংস্থা আমাক নিউজের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ জানায়, ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় আইএসের সদস্যরা দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করেছে। তবে তৎকালীন সরকারের ভাষ্য ছিল—হামলাগুলোর পেছনে ছিল দেশীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী, বিশেষত নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম।
মামলা ও রায়
হোলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। দুই বছরের বেশি সময় তদন্তের পর ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন। আট আসামির মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; একজনকে খালাস দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্ট সাতজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।
এক দশক পর প্রভাব ও সতর্কবার্তা
হোলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। গত এক দশকে বাংলাদেশে ওই মাত্রার আর কোনো হামলা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইএসপন্থী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার দাবি করে। কিন্তু এখনো সতর্কতার জায়গা রয়ে গেছে। কারণ, সন্ত্রাসবাদী সংগঠন অভিযানে ভেঙে দেওয়া যায়; কিন্তু উগ্রবাদী মতাদর্শ, অনলাইন প্ররোচনা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও পরিচয়-সংকটের ভিত্তি ভাঙতে লাগে দীর্ঘমেয়াদি কাজ। তাই ১০ বছর পর গুলশানের সেই রাত শুধু শোকের স্মৃতি নয়; রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্য এখনো এক স্থায়ী সতর্কবার্তা।



