বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত এক দশকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা। উন্নয়ন ব্যয়, অবকাঠামো নির্মাণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকারকে প্রতিবছরই নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে—ঋণের এই প্রবৃদ্ধি কি স্বাভাবিক, নাকি ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত?
ঋণের পরিমাণ ও প্রক্ষেপণ
অর্থ বিভাগের সর্বশেষ মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের মোট সরকারি ঋণ প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। একই সময়ে সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিস্থিতি সরকারি অর্থব্যবস্থা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মোট সরকারি ঋণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। মাত্র এক মাস পর মার্চ শেষে তা বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে মোট সরকারি ঋণ দাঁড়াবে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা, পরবর্তী অর্থবছরে ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরের শেষে তা পৌঁছাবে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন বছরে ঋণ বাড়বে প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকার বেশি। এই বিপুল ঋণের মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা আসবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং প্রায় ১৫ লাখ কোটি টাকা হবে বৈদেশিক ঋণ।
ঋণ বৃদ্ধির কারণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যার মূল উৎস রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন। গত পাঁচ বছরে সরকারি রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ, কিন্তু একই সময়ে সরকারি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। ফলে সরকার পরিচালন ব্যয়, বেতন-ভাতা, পেনশন, সুদ পরিশোধ ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থ জোগাতে ক্রমাগত ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কর থেকে আসা অর্থ দিয়ে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ই পুরোপুরি মেটানো যাচ্ছে না, ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ধার নিতে হচ্ছে।
সুদ পরিশোধের বোঝা
ঋণের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর সুদ। ঋণ যত বাড়ে, সুদের বোঝাও তত বাড়ে। সরকারি প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। তিন বছরের ব্যবধানে সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়বে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হতো, কিন্তু এখন তা চলে যাবে অতীতের ঋণের দায় মেটাতে।
উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে প্রকৃত ব্যয় ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা, কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা আগের প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের পরিমাণ বাড়ার পরও সুদ ব্যয় কমানোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই সুদ পরিশোধে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা পুরো অর্থবছরে ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
বেসরকারি বিনিয়োগে সংকট
সরকার যখন ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ব্যাপক ঋণ নেয়, তখন ব্যাংকগুলো সরকারি ঋণে বেশি আগ্রহী হয়, কারণ ঝুঁকি কম। ফলে শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় ঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন। এই পরিস্থিতিকে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। অর্থ বিভাগের ফিসক্যাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় ৮৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা কমে যেতে পারে, যা শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে।
প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব
রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সরকার ২০২৯ সালে ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরলেও বাস্তবে তা কমে ৬.৪৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। প্রবৃদ্ধির এই পতনের অর্থ হলো কম কর্মসংস্থান, কম বিনিয়োগ ও মানুষের আয় বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া।
বৈদেশিক ঋণের চাপ
পদ্মা সেতুর সংযোগ, মেট্রোরেল, রূপপুর, মাতারবাড়ী, কর্ণফুলী টানেলসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে বিপুল বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে। এখন এসব ঋণের রেয়াতকাল শেষ হয়ে আসছে, ফলে সুদ ও মূলধন উভয়ই পরিশোধ করতে হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হবে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ ডলার, এসডিআর ও জাপানি ইয়েনে। টাকার মান কমলে একই ঋণ পরিশোধে আরও বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। এসব ঋণে নির্মিত অধিকাংশ প্রকল্প সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে না, ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঋণ পরিশোধের প্রকৃত ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
ঋণ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি
আইএমএফ বাংলাদেশকে ‘মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় এবং বেসরকারি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত না করলে ঋণ ব্যবস্থাপনা সম্ভব। কিন্তু অদক্ষ প্রকল্প, ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্বল বাস্তবায়ন ঋণের চাপ অসহনীয় করে তুলতে পারে।
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়বে, মূল্যস্ফীতি উসকে উঠবে এবং ভর্তুকির প্রয়োজন বাড়বে। ফলে বাজেট ঘাটতি আরও বিস্তৃত হবে এবং নতুন ঋণের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
সমাধানের পথ
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ সংকটের সমাধান আরও ঋণ নয়, বরং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা। প্রয়োজন করজাল সম্প্রসারণ, এনবিআরের ডিজিটালাইজেশন, কর ফাঁকি কমানো, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি কমানো, প্রকল্প গ্রহণে কঠোর সম্ভাব্যতা যাচাই, সরকারি ব্যয়ে জবাবদিহি বাড়ানো ও বৈদেশিক ঋণের রিটার্ন নিশ্চিত করা। সরকার এনবিআর সংস্কার ও ডিজিটাল কর প্রশাসনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
বাংলাদেশ এখন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহার, রাজস্ব আয় বাড়ানো ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা গেলে ৩৪ লাখ কোটি টাকার ঋণও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ হ্রাস, প্রবৃদ্ধি মন্থর ও বৈদেশিক ঋণের চাপ অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলো কঠিন অর্থনৈতিক পরীক্ষার সময় হতে পারে।



