এশিয়ার বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রভাব
সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এই বৃদ্ধি ঘটেছে, যেখানে তিনি জানিয়েছেন যে ইরানের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ আটক ও জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪.৭৪ শতাংশ বেড়ে ৯৪.৬৬ ডলারে এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৫.৬ শতাংশ বেড়ে ৮৮.৫৫ ডলারে পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপট
এর আগে শনিবার ইরান ঘোষণা দেয় যে তারা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি তারা সতর্কবার্তা জারি করে যে কোনো জাহাজ প্রণালির দিকে এগোলে হামলা করা হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ইরানের জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয়, যা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ।
আলোচনা ও রাজনৈতিক অবস্থান
ট্রাম্প আরও বলেন যে আলোচনার জন্য মার্কিন প্রতিনিধিরা সোমবার পাকিস্তানে অবস্থান করবেন, যেখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নেতৃত্ব দেবেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে আপাতত এ আলোচনায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা তেহরানের নেই, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানি কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি। আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মার্কির বিশ্লেষক সল কেভোনিক বিবিসিকে বলেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি বার্তার প্রতিক্রিয়াতেই তেলের বাজারে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক প্রভাব
রোববারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ ছিল, এবং ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায় যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইরান দাবি করে যে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত প্রণালি বন্ধ থাকবে। শুক্রবার ট্রাম্পও বলেন যে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত নৌ অবরোধ চলবে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম ওঠানামা করছে, যেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যুদ্ধের আগে ৭০ ডলারের নিচে ছিল এবং ৯ মার্চ প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো চাপে পড়েছে, কারণ এ অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হয়। সরবরাহ সাশ্রয়ে বিভিন্ন দেশে সরকারি কর্মীদের বাসা থেকে কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কর্মসপ্তাহ কমানো হয়েছে, এবং জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় আগেভাগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ নাগরিকদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
চীন ও অন্যান্য দেশের পদক্ষেপ
চীনেও নানা ধরনের কাটছাঁট করা হচ্ছে, যদিও চীনের মজুত প্রায় তিন মাসের আমদানি চাহিদা মেটাতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়। জ্বালানির দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির পর চীন সরকার মূল্যবৃদ্ধির রাশ টানার চেষ্টা করছে। এদিকে, জেট জ্বালানির দাম বাড়ায় এশিয়া অঞ্চলে সেবা দেওয়া বিমান সংস্থাগুলো নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেন যে ইউরোপে হয়তো ছয় সপ্তাহের জেট জ্বালানি মজুত রয়েছে, এবং সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে শিগগিরই ফ্লাইট বাতিল হতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে টানা কয়েক দফা বৃদ্ধির পর গত সপ্তাহের শেষে পেট্রল ও ডিজেলের দাম কিছুটা কমেছে। এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।



