ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত কিশোরগঞ্জের রিয়াদ, পাচারকারীদের চক্রান্ত উন্মোচন
ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত কিশোরগঞ্জের রিয়াদ, পাচারকারীদের চক্রান্ত

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের জড়িয়ে পড়ার খবর পুরোনো হলেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, যুদ্ধে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় কিশোরগঞ্জের এক যুবক নিহত হয়েছেন। তার নাম রিয়াদ রশিদ (২৮) এবং তিনি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের মাঝিরকোনা গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে। শুক্রবার (৮ মে) সন্ধ্যা ৭টার দিকে রিয়াদের বাবা ছেলের মৃত্যুর খবর পান।

যুদ্ধে কত বাংলাদেশি মারা গেছেন?

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কত বাংলাদেশি মারা গেছেন তার প্রকৃত সংখ্যা কেউ জানে না। আবার কতজন এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন তারও হিসাব নেই। গত মার্চে ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুটি বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন জানায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়েছে ১০৪ বাংলাদেশি এবং গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৪ জন মারা গেছেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

মানবপাচারের কাঠামো

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন দুটির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মানবপাচারকারীরা প্রথমে ভুয়া কাজের কথা বলে ভুক্তভোগী বাংলাদেশি পুরুষদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করে। তারপর রুশ ভাষায় লিখিত চুক্তিপত্রে তাদের সাক্ষর করায়, যেটি ভুক্তভোগীরা পড়তেও পারে না। এরপর তৃতীয় একটি দেশের মধ্য দিয়ে তাদের পাচার করে দ্রুত রাশিয়ার সামরিক স্থাপনাগুলোতে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে ইউক্রেনে গিয়ে রাশিয়ার পক্ষে সৈন্য হিসেবে যুদ্ধ করতে তাদের বাধ্য করা হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুদ্ধের ময়দান থেকে বেঁচে ফেরা এক ভুক্তভোগী বলেন, “রাশিয়ায় পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানানো হয়, তারা আমাকে কিনেছে যুদ্ধ করার জন্য।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও জড়িত

মানবাধিকার সংগঠন দুটির অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে কিছু পুরুষ রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে স্বেচ্ছায় যোগ দেন। কিন্তু, পরবর্তীতে নির্যাতনমূলক পরিবেশে তাদের থাকতে হয়েছিল। তথ্য বলছে, শ্রীলঙ্কা থেকে ৭৫১, নেপাল থেকে ৮৫১ এবং ভারত থেকে ১৭০ জন যুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার ২৭৫ জন, নেপালের ১১৬ জন এবং ভারতের ২৩ জন মারা গেছে।

ব্র্যাকের উদ্বেগ

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজের উদ্দেশে বাংলাদেশিদের নিয়ে জোরপূর্বক যুদ্ধে নিয়োজিত করা হচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের পরিবারগুলো কখনও কল্পনাও করেনি যে বৈধ চাকরির জন্য একজন ছেলের বিদেশযাত্রা শেষ হবে—তার নাম যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করে। বিচ্ছিন্ন আকারে যে ঘটনা শুরু হয়েছিল, তা এখন একটি কাঠামোগত প্যাটার্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “গত বছরের শেষের দিক থেকে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম একই ধরনের পাচারের বর্ণনাসহ পরিবারগুলোর কাছ থেকে বেশ কিছু আবেদন পেয়েছে। বৈধ ভিসা, বৈধ ভ্রমণ এবং বেআইনি জবরদস্তি—এগুলো তাদের ভাষ্য, সবার ক্ষেত্রে একই। অন্তত ১০টি পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ আত্মীয়দের কথা জানিয়েছে, যারা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই নিখোঁজ হয়েছিলেন।”

পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক একজনকে সাত থেকে আট লাখ টাকা খরচ করে কাজের প্রলোভনে রাশিয়া নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর জোরপূর্বক একটি কাগজে সই নেওয়া হয়। পরিবারগুলোর দাবি, কাগজটি লেখা রুশ ভাষায় হওয়ায় তারা কেউ বুঝেননি সই কোথায় করছেন। সই করতে যারা অস্বীকৃতি জানাতো, তাদের করা হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।