ওপেক ছেড়ে যাওয়া আমিরাতের সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের জন্য বড় ধাক্কা
ওপেক ছাড়ল আমিরাত, সৌদি আরবের জন্য বড় ধাক্কা

তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক এবং ওপেক প্লাস থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জোটটির ডি ফ্যাক্টো নেতৃত্বদানকারী দেশ সৌদি আরবের জন্য একটি বড় আঘাত। উৎপাদন কোটা নিয়ে দীর্ঘদিনের মতবিরোধের জেরে আমিরাতের এই বিচ্ছেদ কেবল ওপেকের শৃঙ্খলাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং জোটের প্রভাব ও ভবিষ্যতের ওপরও বড় ধরনের ছায়া ফেলেছে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে এ খবর জানিয়েছে।

কোটা বিরোধের পটভূমি

ওপেক তার সদস্য দেশগুলোর তেল উৎপাদনের ওপর নির্দিষ্ট কোটা বা সীমা আরোপ করে, যাতে বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত বহুদিন ধরেই এই কোটা ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে। আমিরাত তাদের তেল শিল্প সম্প্রসারণে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অংশীদারত্ব বাড়াতে আগ্রহী। কিন্তু ওপেকের কঠোর সীমা তাদের সেই সক্ষমতাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে।

আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রী সুহাইল আল মাজরুই মঙ্গলবার নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে বলেন, বিশ্বের আরও জ্বালানি ও সম্পদের প্রয়োজন। আমিরাত কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকতে চায় না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাধীন তেল বিক্রির উচ্চাকাঙ্ক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির সংকট শেষ হলে আমিরাত কারও তোয়াক্কা না করে স্বাধীনভাবে তেল বিক্রি করতে চায়। রাইস্ট্যাড এনার্জির ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান জর্জ লিওন বলেন, দৈনিক ৪৮ লাখ ব্যারেল উৎপাদন সক্ষমতা ও আরও উৎপাদনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা একটি সদস্য দেশকে হারানো ওপেকের হাতের একটি বড় অস্ত্র হারিয়ে ফেলার শামিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সৌদি আরবের জন্য চ্যালেঞ্জ

ওপেকের সদস্য হিসেবে আমিরাতের প্রস্থান সৌদি আরবের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে সংকটের। ঐতিহাসিকভাবে রিয়াদ নিজেদের উৎপাদন কমিয়ে ও অন্যান্য সদস্যকে শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। কিন্তু আমিরাতের মতো বড় উৎপাদনকারী দেশ বেরিয়ে যাওয়ায় এখন বাজার স্থিতিশীল রাখতে সৌদি আরবকে একাই অনেক বেশি উৎপাদন কমানোর ভার নিতে হবে। এতে তেলের দাম ধরে রাখা সৌদি আরবের জন্য আরও ব্যয়বহুল ও কম কার্যকর হয়ে পড়বে।

সৌদি আরবের জন্য তেলের উচ্চমূল্য অত্যন্ত জরুরি। তাদের জাতীয় বাজেট ও উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারের মতো তেলের দাম প্রয়োজন। তেল উৎপাদন কমিয়ে রাখা মানেই রাজস্ব হারানো, যা সৌদি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া এই প্রস্থান ওপেকের ভেতরে সৌদি আরবের আধিপত্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে পুরনো অসন্তোষকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

স্বল্পমেয়াদি প্রভাব সীমিত

তাৎক্ষণিকভাবে আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় কোনও প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা কম। বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওপেক বিশেষজ্ঞ জেফ কোলগ্যান বলেন, স্বল্প মেয়াদে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার প্রভাব বড় হবে বলে মনে হয় না। কারণ হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতিই বৈশ্বিক তেলের বাজারকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে যে, এই খবরটি এখন ছোট মনে হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

তবে দীর্ঘ মেয়াদে আমিরাতের এই পদক্ষেপ তেলের দাম কমিয়ে আনতে পারে এবং বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। ওপেকের ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয় বাড়ছে। জোটটি আগে বিশ্ব সরবরাহ অর্ধেকের বেশি নিয়ন্ত্রণ করত, এখন তা এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমেছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকস-এর ডেভিড অক্সলি মনে করেন, এটি ওপেকের ভেঙে পড়ার শুরুর সংকেত হতে পারে। যদি আমিরাত সফলভাবে কোটার বাইরে স্বাধীনভাবে নিজেদের বাজার বাড়াতে পারে, তবে অন্যান্য সদস্য দেশও একই পথ অনুসরণ করতে পারে। যদিও কাতার (২০১৯), অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, গ্যাবন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো আগে ওপেক ছেড়েছে।