সমুদ্রের তলদেশে নতুন অধ্যায়ের সূচনা
মানুষের তৈরি প্রথম সম্পূর্ণ কার্যকর সাবসি হ্যাবিট্যাট বা পানির নিচের কৃত্রিম বাসস্থান ‘ভ্যানগার্ড’ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা কিজ ন্যাশনাল মেরিন স্যাঙ্কচুয়ারির টেনেসি রিফের পানির ১৭ মিটার গভীরে চালু হয়েছে। সমুদ্র প্রকৌশল সংস্থা ‘ডিপ’ ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির হাত ধরে প্রথমবারের মতো মানুষ সমুদ্রের তলদেশে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছে।
ভ্যানগার্ডে একসঙ্গে চারজন ক্রু মেম্বার থাকতে পারবেন। এটি একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্মের ওপর স্থাপন করা হয়েছে। নাসার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অ্যাকুয়ানট ডন কার্নাগিস বলেন, “বিজ্ঞানীদের জন্য পানির নিচে একটানা সময় কাটানো গবেষণার ক্ষেত্রে এক বিশাল আশীর্বাদ।”
গবেষণায় বিপ্লব
সাধারণত সমুদ্রের গভীর থেকে কোনো নমুনা ওপরে আনা হলে চাপের দ্রুত পরিবর্তনে তার আণবিক বা কোষীয় গঠনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ফলে বিজ্ঞানীরা প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারেন না। ভ্যানগার্ডের ভেতরে বসেই বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের তলদেশের চাপ অপরিবর্তিত রেখে রিয়েল-টাইমে নমুনা পরীক্ষা করতে পারবেন। ভ্যানগার্ড মূলত একটি বড় ডিকম্প্রেশন চেম্বারের মতো কাজ করে, যা ভেতরের বাতাস এবং বায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
ভ্যানগার্ডের বাসিন্দারা স্যাচুরেশন ডাইভার হিসেবে থাকবেন, ফলে তারা প্রথাগত স্কুবা ডাইভিংয়ের ৬০ মিনিটের সীমাবদ্ধতা ভেঙে কয়েক সপ্তাহ বা মাসজুড়ে সমুদ্রের তলদেশে কাটাতে পারবেন। তাঁরা একটি আম্বিলিক্যাল কর্ডের মাধ্যমে ভ্যানগার্ড থেকে সরাসরি বাতাস নিয়ে বাইরে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত পানির নিচে কাজ করতে পারবেন।
মুন পুল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
ভ্যানগার্ডের সবচেয়ে মজার বৈশিষ্ট্য হলো ‘মুন পুল’, যা নিচের দিকে থাকা একটি খোলা দরজা। ভেতরের ও বাইরের বায়ুচাপ সমান রাখায় এই দরজা সরাসরি সমুদ্রের তলদেশের দিকে খোলা থাকলেও ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে না। ডাইভাররা সরাসরি হ্যাবিট্যাটের মেঝে থেকেই সাগরে ঝাঁপ দিতে পারেন।
পানির নিচের এই স্টেশনের সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের সংযোগকারী একটি আম্বিলিক্যাল কেব্লের মাধ্যমে যুক্ত থাকে একটি ভাসমান বয়া। এই বয়াটি ক্রুদের জন্য বাতাস, বিদ্যুৎ এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের ব্যবস্থা করে। ফলে অনশোর বা মূল ঘাঁটির সঙ্গে ক্রুরা ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ রাখতে পারেন। এখানে ব্যবহারের জন্য স্বাদুপানির ট্যাংক রয়েছে এবং বর্জ্য বা পয়ঃনিষ্কাশনের পানি সরাসরি নিরাপদে নিষ্কাশন করা হয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমানে ভ্যানগার্ডকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে এর পেছনে বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা–সংক্রান্ত স্বার্থও জড়িয়ে রয়েছে। ডিপের অংশীদারদের তালিকায় মহাকাশ প্রযুক্তি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানি রয়েছে।
২০২৭ সালের মধ্যে ডিপ ‘সেন্টিনেল’ নামের আরও একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা করছে, যার মাধ্যমে সমুদ্রের যেকোনো মহীসোপানে স্বল্পমেয়াদি বা স্থায়ীভাবে মানববসতি স্থাপন করা সম্ভব হবে। ডন কার্নাগিস আরও বলেন, “আমরা সাবসি হ্যাবিট্যাটকে সাধারণ মানুষের কাছেও নিয়ে যেতে চাই। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী ছাড়াও শিল্পী, ইতিহাসবিদ, শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ এমনকি রাজনীতিবিদদেরও এখানে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারা সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশ ও জীবন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন।”



