ইউরোপে তীব্র দাবদাহে ফ্রান্সে পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু
ইউরোপে তীব্র দাবদাহে ফ্রান্সে পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু

তীব্র ও রেকর্ড ভাঙা দাবদাহে পুড়ছে পুরো ইউরোপ। প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে ও শরীর শীতল করতে ফ্রান্সে পানিতে নেমে গত কয়েক দিনে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকোর্নু এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ফ্রান্সের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ইতালি ও স্পেনও চরম গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ায় স্কুল এবং সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা ও দাবদাহের পুনরাবৃত্তি

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মতে, ইউরোপ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে। ফলে এমন দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র দাবদাহের পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা দিন দিন আরও বাড়ছে।

ফ্রান্সের আবহাওয়া অফিস মেতেও ফ্রান্স জানিয়েছে, দেশের একটি বড় অংশজুড়ে তীব্র হিট অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) স্পর্শ করতে পারে এবং পশ্চিম ফ্রান্সের কিছু অংশে এটি সর্বোচ্চ ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নজিরবিহীন তাপমাত্রা ও রেড অ্যালার্ট

১৯৪৭ সালে তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা শুরুর পর থেকে দেশটি এই প্রথম সবচেয়ে উত্তপ্ত বিকাল এবং রাত প্রত্যক্ষ করলো। আবহাওয়াবিদেরা এই পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে দেশের ৫৪টি প্রশাসনিক অঞ্চলে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছেন। গরম থেকে বাঁচতে ফ্রান্সের মানুষ বিভিন্ন খাল ও নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। ফরাসি ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি বলেন, গরম থেকে বাঁচার এই আকুলতা তিনি বুঝতে পারছেন, তবে অননুমোদিত বা বিপজ্জনক স্থানে সাঁতার কাটার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দাবদাহ নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠকের আগে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকোর্নু বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যুর পরিসংখ্যানে একটি দুঃখজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। আমাদের কাছে আসা সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ জুনের পর থেকে এ পর্যন্ত ৪০ জন মারা গেছেন, যাদের অধিকাংশই তরুণ।

মর্মান্তিক ঘটনা ও শিশু মৃত্যু

অন্য এক মর্মান্তিক ঘটনায়, ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কারপেনত্রাস এলাকার এক প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, সোমবার বাড়ির সামনে পার্ক করা পারিবারিক গাড়ির ভেতর থেকে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন তাদের মা। পরে প্রথম উদ্ধারকারীরা চেষ্টা করেও তাদের আর জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে পারেননি।

প্যারিসে বহুতল ফ্ল্যাটগুলোতে পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা ফ্যানের ব্যবস্থা না থাকায় বাসিন্দারা বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন এবং তীব্র গরমের মধ্যে যাতায়াত করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। গরমের কারণে প্যারিস ও ব্রাসেলসের মধ্যকার ট্রেনসহ বেশ কিছু ট্রেন যাত্রা বাতিল করা হয়েছে।

অর্থনীতিতে ধাক্কা

ব্যবসায়িক নেতারা জানিয়েছেন, এই চরম আবহাওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতিও ধাক্কা খাচ্ছে। ফ্রান্সের নিয়োগকর্তাদের গ্রুপ এমইডিইএফ-এর প্রধান প্যাট্রিক মার্টিন বিএফএম টিভি-কে বলেন, ফ্রান্স এখন ধীরগতিতে চলছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের সুরক্ষায় সম্ভাব্য সব ধরনের সুপারিশ ও নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে। তীব্র চাহিদার কারণে প্যারিসের বেশ কয়েকটি এলাকার দোকানে ইলেকট্রিক ফ্যান শেষ হয়ে গেছে।

ওমেগা ব্লক ও জলবায়ু পরিবর্তন

আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, গ্রিক অক্ষর ওমেগার আকৃতির মতো একটি বিশেষ আবহাওয়া বিন্যাস বা ওমেগা ব্লক-এর কারণে এই তীব্র দাবদাহের সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় মাঝখানে গরম বাতাস আটকে থাকে এবং দুই পাশে ঠান্ডা বাতাস অবস্থান করে, যার ফলে দিনের পর দিন তাপমাত্রা বাড়তেই থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই দাবদাহ ও ঝড় আরও বেশি শক্তিশালী ও তীব্র হচ্ছে, যা তাপমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতেরও কারণ হচ্ছে।

ইতালি, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের অবস্থা

ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ১৫টি শহরের জন্য সর্বোচ্চ স্তরের সতর্কবার্তা জারি করেছে এবং কর্তৃপক্ষ কাজের সময় ও পরিধি কমিয়ে আনার ব্যবস্থা নিয়েছে। মঙ্গলবারের শেষের দিকে আল্পস ও অ্যাপেনাইনস পর্বতমালার ওপর ঝড়ের পূর্বাভাস রয়েছে, যা ভারী বৃষ্টিপাত, দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টি বয়ে আনতে পারে।

যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার দক্ষিণ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা জুনের নতুন রেকর্ড হতে পারে। বুধ ও বৃহস্পতিবার এই তাপমাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী বসার অনুপযোগী পুরোনো স্কুল ভবনগুলোতে তাপমাত্রা ধরে রাখতে না পারায় ডজনখানেক স্কুল তাদের ছুটি এগিয়ে নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে।

স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা দেশের বিভিন্ন অংশে রেড অ্যালার্ট জারি করে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রার তাপমাত্রা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে। এর আগে সোমবার দেশটির আন্দুজার এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছিল। রাতেও গরম থেকে নিস্তার মিলছে না; মঙ্গলবার ভোরের দিকেও দেশটির প্রায় ৩০টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রেকর্ড করা হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মাদ্রিদ প্রশাসন গৃহহীনসহ ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য বিশেষ ‘জলবায়ু আশ্রয়কেন্দ্র’ খুলেছে। মাদ্রিদের সামুর সোশ্যালের জুয়ান কার্লোস আরিলানো বলেন, এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার পরিবেশ প্রদানের পাশাপাশি মৌলিক খাবার, গোসল এবং কিছু সময় বিশ্রামের সুযোগ করে দেবে।

বেলজিয়ামে পরীক্ষা গির্জায় স্থানান্তর

বেলজিয়ামের ব্রাসেলসের কাছে তেরভুরেন এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাসরুমের প্রচণ্ড গরমের কারণে বার্ষিক সমাপনী পরীক্ষা কাছের একটি গির্জায় স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। স্কুলটি তাদের ইনস্টাগ্রামে গির্জার চেয়ারে বসে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেওয়ার ভিডিও পোস্ট করে লিখেছে, ‘ক্লাসরুমে বড্ড গরম, তাই গির্জাতেই পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।’

পরিবহন নেটওয়ার্কে চাপ

তীব্র এই দাবদাহের কারণে পুরো ইউরোপের পরিবহন নেটওয়ার্ক ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। ব্রিটেনের নেটওয়ার্ক রেল যাত্রীদের সতর্ক করে বলেছে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছালে গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে, তাই খুব জরুরি না হলে যেন তারা ভ্রমণ না করেন। লন্ডনে রাতভর চলা বজ্রঝড় এবং অস্থির আবহাওয়ার কারণে হিথ্রো বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও বেশি ব্যাহত হয়েছে।