ভালো ঘুমের জন্য ঘুমানোর ৩০ মিনিট আগে ফোন বন্ধের অভ্যাস
ভালো ঘুমের জন্য ফোন বন্ধের অভ্যাস

ঘুম শুধু দৈনন্দিন ক্লান্তি দূর করার একটি বিশ্রামের সময় নয়—এটি শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের স্বাভাবিক ‘রিসেট’ প্রক্রিয়া। আমরা যখন ঘুমাই, তখন শরীর নিজের ভেতরের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করে, শক্তি পুনরুদ্ধার করে এবং মস্তিষ্ক দিনের সব তথ্য গুছিয়ে নেয় ও স্মৃতি শক্তিশালী করে। ফলে ভালো ঘুম শুধু পরের দিনের সতেজতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক স্থিতিশীলতা এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

আজকের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় অনিয়মিত ঘুম, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং মানসিক চাপের কারণে অনেকেরই ঘুমের মান কমে যাচ্ছে। অথচ কিছু ছোট কিন্তু সচেতন অভ্যাস ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এসব অভ্যাস শুধু দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে না, বরং ঘুমকে আরও গভীর ও কার্যকর করে তোলে।

তাই ভালো ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া মানে আসলে নিজের শরীর ও মনকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফোন ব্যবহার বন্ধ

স্মার্টফোন এখন আমাদের অনেকের ঘুমানোর ঠিক আগ মুহূর্তের শেষ সঙ্গী হয়ে উঠেছে। কিন্তু রাতের ঘুম আরও ভালো করার জন্য একটি ছোট্ট ও কার্যকর অভ্যাস হলো ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করে সেটিকে দূরে সরিয়ে রাখা।

বিষয়টি শুনতে খুবই সহজ মনে হলেও, বাস্তবে এটি অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ দিনের শেষে আমরা অনেকেই মানসিক ক্লান্তি কাটাতে বা একটু বিনোদনের খোঁজে স্ক্রিনের ওপর নির্ভর করে থাকি।

সারাদিনের ব্যস্ততা আর ক্লান্তির পর আমরা যখন বিছানায় যাই, তখন আলো নেভানোর আগ পর্যন্ত ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করতে থাকি। নিজের মনকে বোঝাই এসব দেখলে হয়তো ধীরে ধীরে ঘুম চলে আসবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই উল্টো।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক মার্কেট রিসার্চ ও ডেটা অ্যানালিটিক্স কোম্পানি ‘ইউগো’ ঘুমের ওপর বিভিন্ন ধরনের জরিপ চালিয়ে একটি জনমত সংগ্রহ করে। ২০২৫ সালে পরিচালিত সেই জরিপে দেখা যায়, ৪৩ শতাংশ আমেরিকান জানিয়েছেন—তারা ঘুমানোর আগে ‘সবসময় বা প্রায়ই’ ফোনে ইন্টারনেট ব্রাউজ করেন।

ঘুম নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু অতিরিক্ত বা নেতিবাচক কনটেন্ট দেখলেই নয়, সাধারণভাবে ফোন ব্যবহার করলেও রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে।

এ বিষয়ে সেন্ট লুইসের জন জে. ককরান ভেটেরান্স হাসপাতালের স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শালিনী পারুথি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিড দেখতে যতই শান্ত বা আরামদায়ক মনে হোক না কেন, এটি আসলে মস্তিষ্ককে সক্রিয় ও উদ্দীপ্তই রাখে।

তিনি আরও বলেন, এখানে শুধু চোখে দেখা কনটেন্ট নয়, বরং মানসিক চিন্তাভাবনা, আবেগ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়ার একটি ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়, যা মস্তিষ্ককে স্বাভাবিকভাবে শান্ত হতে বাধা দেয়।

তাই ঘুমের প্রস্তুতির জন্য ঘুমানোর ৩০ মিনিট আগে ফোন বন্ধ করে দিন, এবং পুরো রাত সেটি বন্ধ অবস্থায় রাখার চেষ্টা করুন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আপনার ফোনটিকে হাতের নাগালের বাইরে রাখুন—এমন জায়গায় রাখুন যেখানে নিতে হলে আপনাকে বিছানা ছেড়ে উঠতে হবে।

এমন পরামর্শ দিয়েছেন কস্টাডিন কুশলেভ, যিনি জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং ‘হ্যাপি টেক ল্যাব’-এর পরিচালক।

ডা. শালিনী পারুথি পরামর্শ দেন, ফোনটি ’ডু নট ডিসটার্ব’ মোডে রাখুন এবং সেটিংসে শুধু কাছের মানুষের কাছ থেকে আসা কলগুলো অনুমোদিত রাখুন।

ডা. শালিনী পারুথি পরামর্শ দিয়েছেন, আগে থেকেই এমন কিছু “অ্যানালগ” বা ফোনবিহীন কাজের পরিকল্পনা করে রাখা ভালো—যেগুলো আপনি স্ক্রল করার বদলে করতে পারবেন।

আপনি এই আধা ঘণ্টাকে একটি সৃজনশীল অতিরিক্ত সময় হিসেবে ভাবতে পারেন। এই সময়ে কারও কাছে চিঠি লিখতে পারেন, ডায়েরি বা জার্নাল শুরু করতে পারেন, কিংবা বুননের মতো কোনও হাতে করা কাজ করতে পারেন।

অথবা চাইলে আপনি সেই সময়টা শান্ত ও মনকে স্থির করে এমন কিছু কাজে ব্যয় করতে পারেন—যেমন ধ্যান করা।

‘বডি ইলেকট্রিক: দ্য হিডেন হেলথ কস্টস অব দ্য ডিজিটাল এজ অ্যান্ড নিউ সায়েন্স টু রিক্লেইম ইওর ওয়েল-বিইং’ বইয়ের লেখক মানুশ জোমোরোদি জানান, তিনি ঘুমানোর আগে পায়ের নিচে ম্যাসাজ বল গড়িয়ে নেন, যা শরীরের টান কমায় এবং তাকে শিথিল করে।

তিনি আরও বলেন, তার আদুরে কুকুরকে আদর করেন, যে তার জন্য এক ধরনের রিল্যাক্সেশন ট্যালিসম্যানের মতো কাজ করে।

ঘুমানোর সময় সঙ্গে একটি বই নিয়ে যাওয়া ভালো অভ্যাস হতে পারে।

ডা. কস্টাডিন কুশলেভও পরামর্শ দিয়েছেন, সম্ভব হলে একটি বই পড়া—বিশেষ করে কাগজের বই।

লেখক অ্যান প্যাচেটেরও এমন পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন বই বেছে নেওয়া উচিত যা পড়তে ভালো লাগে এবং মনকে আরাম দেয়—এবং এমন কিছু নয় যা আগে থেকেই জানেন আপনাকে অস্বস্তি বা দুশ্চিন্তায় ফেলবে। (যেমন, তিনি হরর বা ভয়ের গল্প এড়িয়ে চলেন।)

এখন প্রতিদিন ঘুমানোর আগে এই ৩০ মিনিটের ডিজিটাল ডিটক্স এক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা করে দেখুন—আপনি কি দ্রুত ঘুমাতে পারছেন, বা আগের চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমিয়ে থাকতে পারছেন কি না, এমনকি সামান্য হলেও পরিবর্তন আছে কি না।

ডা. শালিনী পারুথি বলেন, “ছোট কোনও পরিবর্তনও এক ধরনের সাফল্য।”