রেডিওথেরাপি সেবায় বৈষম্য: চিকিৎসা পেতে রোগীর ঠিকানাই বাধা
রেডিওথেরাপি সেবায় বৈষম্য: ঠিকানা বাধা চিকিৎসায়

রেডিওথেরাপি সেবায় শহর-প্রান্তরের বৈষম্য

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. আরমান রেজা চৌধুরী বলেছেন, রেডিওথেরাপি সেবার ক্ষেত্রে দেশের বড় শহর ও প্রান্তিক অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন ক্যান্সার রোগী কোথায় জন্মেছেন বা কোথায় থাকেন, সেটি কখনোই তার চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নির্ধারণ করা উচিত নয়। বাস্তবে অনেক রোগীর জন্য ঠিকানাই হয়ে উঠছে চিকিৎসা পাওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা।

ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির গুরুত্ব

রেডিওথেরাপি ক্যান্সার চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অংশ। স্তন ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সার, মাথা-ঘাড়ের ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, মলদ্বারের ক্যান্সার, মস্তিষ্কের টিউমারসহ বহু ক্যান্সারে রেডিওথেরাপি দরকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি রোগ নিরাময়ের অংশ, অপারেশনের পর রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি কমায়, আবার ব্যথা, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট বা স্নায়বিক জটিলতা কমিয়ে জীবনমান উন্নত করে।

বাংলাদেশে সেবার অসম বণ্টন

বাংলাদেশের বাস্তবতায় রেডিওথেরাপি সুবিধা প্রধানত বড় শহরকেন্দ্রিক। ঢাকাসহ কয়েকটি বিভাগীয় শহরে কিছু সুবিধা থাকলেও দেশের বহু জেলা ও বড় জনগোষ্ঠী এখনো কার্যত এই সেবার বাইরে। উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকার রোগীদের জন্য রেডিওথেরাপি নিতে হলে অনেক সময় শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। ডা. চৌধুরী উল্লেখ করেন, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম বা লালমনিরহাটের একজন দরিদ্র রোগীর জন্য ঢাকায় এসে কয়েক সপ্তাহ থাকা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদী খরচ ও সময়

রেডিওথেরাপি সাধারণত একদিনের চিকিৎসা নয়; অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিদিন হাসপাতালে যেতে হয়। ফলে রোগীর সঙ্গে পরিবারের একজন সদস্যকেও থাকতে হয়। যাতায়াত, থাকা, খাবার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং কর্মজীবনের ক্ষতি মিলিয়ে চিকিৎসার প্রকৃত খরচ অনেক বেড়ে যায়। অনেক পরিবার চিকিৎসা শুরু করার আগেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করেন, কেউ চিকিৎসাই নিতে পারেন না। ফলে ক্যান্সার শুধু একটি রোগ থাকে না, এটি হয়ে ওঠে একটি পরিবারের আর্থিক পতনের কারণ।

সময়মতো চিকিৎসা না পেলে ঝুঁকি

রেডিওথেরাপির ক্ষেত্রে সময়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপারেশনের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রেডিওথেরাপি শুরু করা দরকার হতে পারে। কেমোথেরাপির সঙ্গে সমন্বিতভাবে চিকিৎসা দিতে হয় অনেক রোগীকে। দীর্ঘ অপেক্ষা, মেশিনের স্বল্পতা, দূরত্বের কারণে দেরি বা চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থাকা রোগীর ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ রেডিওথেরাপি না পাওয়া শুধু একটি সুবিধা না পাওয়ার বিষয় নয়, এটি সরাসরি রোগীর বেঁচে থাকা, সুস্থ হওয়া এবং কষ্ট কমার সঙ্গে সম্পর্কিত।

জাতীয় পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক কেন্দ্রের প্রয়োজন

বাংলাদেশে রেডিওথেরাপি সেবা সম্প্রসারণের জন্য জাতীয় পর্যায়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। জনসংখ্যা, ক্যান্সারের আনুমানিক বোঝা, ভৌগোলিক দূরত্ব, দারিদ্র্য, বিদ্যমান হাসপাতাল অবকাঠামো এবং রোগীর যাতায়াত সক্ষমতা বিবেচনায় আঞ্চলিক ক্যান্সার সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি বিভাগে পূর্ণাঙ্গ রেডিওথেরাপি সুবিধা থাকা প্রয়োজন, এবং বড় জেলা বা মেডিকেল কলেজভিত্তিক ক্যান্সার সেবা ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করা জরুরি।

দক্ষ জনবল ও অবকাঠামো

এক্ষেত্রে শুধু মেশিন কিনলেই হবে না। রেডিওথেরাপি একটি টিম ওয়ার্ক। এখানে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, অনকোলজি নার্স, ডোজিমেট্রিস্ট, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং মান নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী ব্যবস্থা। মেশিন স্থাপন, জনবল তৈরি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো, রোগী ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যভিত্তিক মনিটরিং একসঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে।

পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ও অর্থায়ন

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি জমি, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালকে কেন্দ্র করে বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য তহবিল, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে রেডিওথেরাপি সেবা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। তবে এই সেবা যেন শুধু বাণিজ্যিক না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র রোগীর জন্য ভর্তুকি, স্বাস্থ্যবিমা, সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল এবং সরকারি সহায়তা থাকা জরুরি।

জাতীয় রেডিওথেরাপি ম্যাপিংয়ের গুরুত্ব

আরেকটি জরুরি বিষয় হলো জাতীয় রেডিওথেরাপি ম্যাপিং। কোন অঞ্চলে কত রোগী, কত দূরে নিকটতম রেডিওথেরাপি কেন্দ্র, কতটি মেশিন কার্যকর, কতদিন অপেক্ষা করতে হয়, কত রোগী চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রাখেন, এসব তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। তথ্য ছাড়া পরিকল্পনা করলে উন্নয়ন অসম থেকে যায়। ক্যান্সার রেজিস্ট্রি, হাসপাতালভিত্তিক তথ্য এবং জাতীয় ক্যান্সার কন্ট্রোল প্রোগ্রামের সঙ্গে রেডিওথেরাপি পরিকল্পনাকে যুক্ত করা প্রয়োজন।

রোগীর প্রয়োজনই হোক মূল ভিত্তি

বাংলাদেশের মতো দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো তৈরি করতে হলে ‘রোগী কোথায় থাকেন’ নয়, ‘রোগীর কী প্রয়োজন’ সেটিই মূল বিবেচনা হতে হবে। একজন রোগী ঢাকায় থাকলে দ্রুত চিকিৎসা পাবেন, আর দিনাজপুর, পটুয়াখালী, বান্দরবান বা কুড়িগ্রামে থাকলে চিকিৎসা পেতে দেরি হবে, এটি কোনো ন্যায়সঙ্গত স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। স্বাস্থ্যসেবা তখনই মানবিক হয়, যখন তা মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। রেডিওথেরাপি সেবা বিকেন্দ্রীকরণ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের দাবি। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জাতীয় পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল উন্নয়ন, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের দৃঢ়তা। ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার তার ঠিকানা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। রেডিওথেরাপি সুবিধা সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নিকটবর্তী করা এখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

লেখক: ডা. আরমান রেজা চৌধুরী, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকা।