জাপান আগের অবস্থানে নেই—এমনই এক বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায়। গবেষকদের দাবি, ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রায় ১৫ মিনিট পর দেশটির ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে পূর্ব দিকে সরে যায়। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ভূ-পদার্থবিদ সানইয়ং পার্ক। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএন।
ভূমিকম্পের পর জাপানের ভূখণ্ডের পরিবর্তন
২০১১ সালের ১১ মার্চ স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৪৬ মিনিটে জাপানে ৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। জিপিএস তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভূমিকম্পের কিছু সময় পর হোক্কাইডো থেকে কিউশু পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল প্রায় একই সময়ে পূর্ব দিকে স্থানচ্যুত হয়। প্রথমে বিজ্ঞানীরা এটিকে তথ্যগত ত্রুটি বা যন্ত্রের ভুল বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের বিশ্লেষণের পর গবেষকেরা নিশ্চিত হন, ঘটনাটি বাস্তব ছিল এবং এর পেছনে কাজ করেছে এক বিরল ভূ-ভৌত প্রক্রিয়া।
ভূকম্পন তরঙ্গের প্রতিফলন
গবেষণা অনুযায়ী, ভূমিকম্পে সৃষ্ট শক্তিশালী ভূকম্পন তরঙ্গ পৃথিবীর গভীরে থাকা তরল ধাতব বহিঃকেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছে সেখান থেকে প্রতিফলিত হয়ে আবার ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে। প্রায় ৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফিরে আসা এই তরঙ্গের প্রভাবে জাপানের নিচে থাকা চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটে সামান্য নড়াচড়া সৃষ্টি হয়। গবেষক পার্কের ভাষায়, সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল যে জাপানের প্রায় পুরো ভূখণ্ড একই সময়ে প্রায় সমানভাবে সরে যাচ্ছিল। এই নড়াচড়া মূল ভূমিকম্প বা বড় কোনো আফটারশকের সঙ্গে ঘটেনি বরং সেগুলোর আগেই এটি সংঘটিত হয়।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা
ভূকম্পনবিদেরা আগে থেকেই জানতেন যে বড় ভূমিকম্পের তরঙ্গ পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে প্রতিফলিত হতে পারে। তবে এত গভীর থেকে ফিরে আসা কোনো তরঙ্গের ভূপৃষ্ঠে এত স্পষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে—এমন প্রমাণ আগে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ গোরান একস্ট্রম জানান, ২০১১ সালের মূল ভূমিকম্পে জাপানের নিচের দুটি টেকটোনিক প্লেট প্রায় ১০ মিটার সরে গিয়েছিল। এর ফলেই সুনামির সৃষ্টি হয় এবং জাপানের প্রধান দ্বীপ হনশু প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পূর্ব দিকে সরে যায়। তবে নতুন গবেষণায় যে স্থানচ্যুতির কথা বলা হয়েছে, তা মূল কম্পনের পরবর্তী ঘটনা।
শক্তির পরিমাণ ও প্রভাব
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই দেশব্যাপী মৃদু স্থানচ্যুতির পেছনে যে শক্তি কাজ করেছে, তা প্রায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের সমতুল্য। তবে শক্তিটি বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর কেন্দ্র ঘুরে ফিরে আসা এই ধরনের তরঙ্গ ভূত্বকের বিভিন্ন ফল্টকে পুনরায় সক্রিয় করতে পারে এবং দূরবর্তী প্লেট-সংযোগস্থলেও নড়াচড়ার সূচনা ঘটাতে সক্ষম।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মূল্যায়নে গুরুত্ব
ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের ভূতাত্ত্বিক অধ্যাপক ভেদরান লেকিচ বলেন, জাপানের অত্যাধুনিক ভূকম্পন ও স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকায় এত সূক্ষ্ম ঘটনা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলোতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু পর্যাপ্ত প্রযুক্তির অভাবে তা নজরে আসছে না। গবেষণায় যুক্ত না থাকলেও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ভূ-পদার্থবিদ আমান্ডা থমাস এই গবেষণাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, বড় ভূমিকম্পের প্রভাব শুধু মূল কম্পন বা আফটারশকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অনেক সময় পরে ফিরে আসা গভীর ভূকম্পন তরঙ্গও ফল্ট সিস্টেমে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটাতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পৃথিবীর গভীরের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং ভবিষ্যতে ভূমিকম্প-পরবর্তী ঝুঁকি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



