যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিপরীতে ইরানের অবিশ্বাস্য পাল্টা প্রতিরোধ বিশ্ববাসীকে বর্তমানে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিরে আসায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে এক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তাঁর আগের মেয়াদের নানা খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাত—সব মিলিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের এক বাস্তব ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। যদি সত্যিই এমনটা ঘটে, তাহলে গ্রাউন্ড জিরো বা বিস্ফোরণের মূল কেন্দ্রের আশপাশে থাকা মানুষ তো বটেই, নিশ্চিতভাবে তেজস্ক্রিয়তার মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা জনপদেও। তাই নিজেদের নিরাপদে রাখতে সুরক্ষার মৌলিক নীতিগুলো সম্পর্কে জানা এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
তবে কয়েকটি সাধারণ কৌশল প্রয়োগ করে এমন মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক ও পরবর্তী প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা যেতে পারে। পারমাণবিক বিস্ফোরণের আগে, চলাকালীন কিংবা পরে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকরী কৌশল হলো কোনো শক্তপোক্ত ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া।
আশ্রয় নেওয়ার নিয়ম
বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা আঘাত হানার আগে একটি নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার জন্য সাধারণত ১০ মিনিট বা তার চেয়ে সামান্য বেশি সময় পাওয়া যায়। এই সময়ের মধ্যে ইট বা কংক্রিট দিয়ে নির্মিত কোনো ভবন চোখে পড়লে কালবিলম্ব ছাড়াই সেখানে প্রবেশ করতে হবে। এ ধরনের ভবনের মাটির নিচের বেজমেন্ট বা একদম মাঝখানের অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ। তবে নানা ফাঁকফোকর গলে এখানেও পৌঁছে যেতে পারে উচ্চশক্তির গামা রশ্মি ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তেজস্ক্রিয় কণা। তাই শুরুতেই এসব জায়গার সব দরজা-জানালা ভালোভাবে আটকে দিতে হবে। পাশাপাশি বাতাস টেনে ভেতরে আনে এমন যন্ত্র, যেমন এসি, ফ্যান বা হিটার ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে।
সাধারণত বিস্ফোরণ-পরবর্তী প্রথম ২৪ ঘণ্টায় বাইরে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত কমে আসে। তাই অগ্নিকাণ্ড, গ্যাস লিকেজ, ভবন ধস অথবা মারাত্মক আহত হওয়ার শঙ্কা দেখা না দিলে, কিংবা কর্তৃপক্ষ বাইরে বের হওয়াকে নিরাপদ ঘোষণা না করা পর্যন্ত কমপক্ষে এক দিন ভবনের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করা বাঞ্ছনীয়। পরিস্থিতিভেদে ঘরের মধ্যে এক মাসও থাকতে হতে পারে।
এই কৌশলে যে আসলেই কাজ হয়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ জাপানের হিরোশিমা শহরের অধিবাসী ইজো নোমুরা। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্টের সেই বিভীষিকাময় দিনে তিনি একটি ভবনের বেজমেন্টে অবস্থান করছিলেন। সেটি ছিল পারমাণবিক বোমা লিটল বয় বিস্ফোরণের স্থান থেকে মাত্র ১৭০ মিটার দূরে! বিস্ফোরণের এত কাছে থাকার পরও তিনি সেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। পরে তিনি মারা যান ১৯৮২ সালে, ৮৪ বছর বয়সে।
বাইরে বা যানবাহনে থাকলে করণীয়
বিস্ফোরণের সময় হাতের কাছে যথোপযুক্ত ভবনের অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে। আবার অনেকেই চলতি পথে বা যানবাহনে থাকতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে নিরাপদে থাকতে চাই বাড়তি সতর্কতা।
সর্বপ্রথম যে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে তা হলো, বিস্ফোরণের তীব্র আলো বা আগুনের কুণ্ডলীর দিকে কখনোই সরাসরি তাকানো যাবে না। এতে চোখের কর্নিয়া পুড়ে যেতে পারে, সাময়িকভাবে অন্ধ হয়ে যেতে পারেন, অথবা চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বিস্ফোরণের সময় যদি বাইরে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় হাতের নাগালে না থাকে, তাহলে প্রথমে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে হবে এবং দুই হাত দিয়ে নিজের মাথা ঢেকে রাখতে হবে। পাশাপাশি মুখ ও নাক মাস্ক, কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে ঢাকতে হবে। এটি প্রশ্বাসের সঙ্গে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় কণার শরীরে প্রবেশ ঠেকাতে সাহায্য করবে। সম্ভব হলে শক্তপোক্ত কোনো বস্তু, যেমন—দেয়াল বা বড় যানবাহনের পেছনেও আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে কেউ যদি চলন্ত গাড়ির ভেতরে থাকেন, তাহলে প্রথম কাজ হলো নিরাপদে গাড়ি থামানো। তবে কোনোভাবেই সেতুর নিচে বা দুর্বল কাঠামোর পাশে গাড়ি থামানো যাবে না। এরপর জানালার কাচের নিচে সিটের ওপর বা মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে হাত দিয়ে মাথা শক্ত করে ঢেকে রাখতে হবে। বিস্ফোরণের পর সাধারণত দুটি বড় শকওয়েভ আসে। তাই অন্তত দুই মিনিট কোনো নড়াচড়া করা যাবে না।
আগেই বলেছি, মোটামুটি ১০ মিনিটের মধ্যে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা আকাশ থেকে পড়তে শুরু করে। গাড়ির পৃষ্ঠ এগুলোকে আটকাতে পারে না। তাই বিস্ফোরণের প্রাথমিক ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর গাড়ি থেকে নেমে অবিলম্বে কোনো ভবনের আশ্রয় খুঁজে বের করা জরুরি। সেটি সম্ভব না হলে গাড়ির এসি বা ভেন্টিলেশন সিস্টেম সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে জানালার কাচ পুরোপুরি তুলে দিতে হবে। এতে বাইরের দূষিত বাতাস ভেতরে ঢোকার আশঙ্কা অনেকখানি কমে যাবে।
জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়া
কেউ যদি তেজস্ক্রিয় ধূলিকণার সংস্পর্শে চলেই আসে, তাহলে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যতটা দ্রুত সম্ভব জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এ জন্য প্রথমেই পরনের সব পোশাক খুলে ফেলতে হবে। কেবল বাইরের স্তরের পোশাক সরিয়ে ফেললেই প্রায় ৯০ শতাংশ তেজস্ক্রিয় পদার্থ শরীর থেকে দূর করা সম্ভব। খোলা পোশাকগুলোকে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে রেখে মুখ সিল করে দিতে হবে এবং মানুষ ও পশুপাখি থেকে দূরে রাখতে হবে।
এরপর দ্রুত গোসল করতে হবে। প্রচুর সাবান ও পানি ঢেলে শরীর থেকে সব অবাঞ্ছিত বস্তু সরিয়ে ফেলতে হবে। মাথার চুলে শ্যাম্পু করা যেতে পারে, কিন্তু কন্ডিশনার ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষেধ! কারণ, এটি তেজস্ক্রিয় পদার্থকে চুলের সঙ্গে আটকে ফেলে। এই সময়ে আলতো করে নাক ঝাড়তে হবে এবং পরিষ্কার ভেজা কাপড় দিয়ে চোখের পাতা ও কান আলতো করে মুছে নিতে হবে।
আর যদি কোনো কারণে গোসল করা সম্ভব না হয়, তাহলে শরীরের যেসব অংশ পোশাকে ঢাকা ছিল না, সেগুলো ভেজা কাপড় বা টিস্যু দিয়ে খুব ভালোভাবে মুছে ফেলতে হবে।
আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাথমিক চিকিৎসা
এবারে জেনে নেওয়া যাক তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে। শুরুতেই রোগীর শরীরের সব পোশাক খুলে কুসুম গরম পানি ও সাবান দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করতে হবে। দেহের ছিদ্রপথগুলো, যেমন—নাক, কান ইত্যাদির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।
পারমাণবিক বিস্ফোরণে কেউ আহত হলে ক্ষতস্থানের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় পদার্থ সহজেই শরীরের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমন কোনো ক্ষতস্থান চোখে পড়লে প্রথমে দ্রুত প্রচুর পানি বা স্যালাইন পানি দিয়ে তা সাবধানে ধুয়ে ফেলতে হবে। তারপর খোলা ক্ষতের চারপাশের ত্বক ওয়াটারপ্রুফ ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, যাতে তেজস্ক্রিয়তা দেহের অন্য কোনো অংশে ছড়িয়ে না পড়ে।
কোনোভাবে যদি মুখে তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রবেশ করে, তবে অবিলম্বে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজতে হবে এবং ৩ শতাংশ সাইট্রিক অ্যাসিড সলিউশন দিয়ে মুখ কুলকুচি করতে হবে। নাসারন্ধ্র আক্রান্ত হলে ৩ শতাংশ হাইড্রোজেন পারক্সাইড সলিউশন দিয়ে গলা পরিষ্কার বা গড়গড়া করা উচিত। আর চোখের বেলায় ব্যবহার করতে হবে প্রচুর পরিষ্কার পানি।
আক্রান্ত ব্যক্তির চুল পরিষ্কারে কুসুম গরম পানি এবং হালকা সাবান বা শ্যাম্পুই যথেষ্ট। তবে খেয়াল রাখতে হবে, চুল ধোয়ার এই দূষিত পানি যেন গড়িয়ে শরীরের অন্য কোনো অংশে না লাগে।
আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতাল বা অন্যত্র স্থানান্তরের সময় দুই স্তরের চাদর দিয়ে মুড়িয়ে নেওয়াটা অধিকতর নিরাপদ। স্থানান্তরের পরে যানবাহন ও ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলোর জীবাণুমুক্তকরণ এবং সমস্ত দূষিত বস্তু সরিয়ে নেওয়া চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী কর্মীর অন্যতম দায়িত্ব।
এখানে একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সময় যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, যেমন গ্লাভস, ডিসপোজেবল ওভারঅল (একবার ব্যবহারযোগ্য বিশেষ পোশাক) এবং রেসপিরেটর মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি রোগীকে সহায়তা করার শেষে নিজের শরীরকেও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। নয়তো তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আপনি নিজেও রক্ষা পাবেন না।
বোমা হামলার আগের প্রস্তুতি
পারমাণবিক বোমা হামলা হওয়ার আশংকা আছে, এমন এলাকার বাসিন্দারা আগেভাগেই বেশ কিছু প্রস্তুতি সেরে রাখাতে পারেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্র ঠিক করে রাখা। এ জন্য অফিস বা বাসার বেজমেন্টকে সবার আগে বিবেচনা করা উচিত। সেখানে নিচের তালিকার জিনিসপত্রগুলো প্রস্তুত ও জমা রাখা যেতে পারে।
- সারভাইভাল কিট: অতিরিক্ত ব্যাটারিসহ টর্চলাইট, পাওয়ার ব্যাংক এবং ব্যাটারিচালিত একটি এএম রেডিও।
- ফার্স্ট এইড কিট: প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। পাশাপাশি পুড়ে গেলে বা জখম হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যায়, এমন ওষুধ ও সরঞ্জাম।
- খাবার পানি: জনপ্রতি প্রতিদিন দুই লিটার হিসেবে কয়েক দিনের বোতলজাত খাবার পানি।
- ধোয়া-মোছার পানি: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে এবং তেজস্ক্রিয় উপাদান ধুয়ে ফেলতে কয়েক দিনের পানি মজুত রাখতে হবে। এ জন্য জনপ্রতি প্রতিদিন দুই-চার লিটার পানি রাখলেই যথেষ্ট। এক বা দুই সপ্তাহের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানির ব্যবস্থা রাখা বাঞ্ছনীয়।
- শুকনো খাবার: কয়েক দিনের জন্য পরিমাণ মতো শুকনো খাবার রাখতে হবে।
- অন্যান্য: অতিরিক্ত কিছু পোশাক ও জুতা রাখা ভালো।
এ ছাড়া পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় কার কী করণীয় হবে, সে সম্পর্কে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি আগাম কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে নেওয়া যেতে পারে। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দেওয়া যেতে পারে। ছোট শিশুদের জামাকাপড়ে নাম-ঠিকানা জুড়ে দেওয়া আরেকটি প্রয়োজনীয় কৌশল। কেউ বাইরে হারিয়ে গেলে যাতে ঠিকানা দেখে অন্যরা সাহায্য করতে পারে।
আশা করি, এই তথ্যগুলো আপনাদের কখনোই বাস্তবে ব্যবহারের প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু বিশ্বব্যবস্থা দিনে দিনে যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে হয়তো স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রত্যাশা করাই এখন চরম বিলাসিতা!
লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড
সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন রেডিওলজিক্যাল প্রোটেকশন



