স্বাস্থ্য খাতে পিপিপি ও স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্য খাতে পিপিপি ও স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ডেঙ্গু কিংবা হামের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর চিত্র স্পষ্ট করে সামনে এসেছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং গ্রহণের গুরুত্ব নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হয়ে আসছে। স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা, দক্ষতা ও গুণগত মান উন্নয়ন দুই পদ্ধতিরই লক্ষ্য হলেও কার্যপদ্ধতি ও উদ্দেশ্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

পিপিপি ও স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিংয়ের পার্থক্য

পিপিপি ব্যবস্থায় সরকার কোনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা সেবার সম্পূর্ণ বা আংশিক পরিচালনার দায়িত্ব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্পণ করে। অন্যদিকে, স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিংয়ের ক্ষেত্রে সরকার নাগরিকদের পক্ষে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি প্রদানকারীদের কাছ থেকে ক্রয় করে। তবে নীতিনির্ধারণ, অর্থায়ন, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের হাতেই থাকে।

বাংলাদেশে পিপিপির অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে পিপিপি চালুর জন্য অতীতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১০-২০ শয্যার ছোট সরকারি হাসপাতাল পিপিপি পদ্ধতিতে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে পিপিপির উদাহরণ হলো জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্যান্ডর-এর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ডায়ালাইসিস সেবা প্রদান। এ উদ্যোগ ডায়ালাইসিস সেবার প্রাপ্যতা বাড়ালেও চুক্তিকাঠামো, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং অর্থের যথাযথ মূল্য (ভ্যালু ফর মানি) নিয়ে বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিংয়ের সীমিত অভিজ্ঞতা

একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং সম্পর্কেও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সীমিত। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকার কিছু স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু পরিচালনাগত ও সুশাসন–সংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জের কারণে উদ্যোগটি প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। এসব অভিজ্ঞতা দেখায় যে শুধু বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করলেই সফলতা নিশ্চিত হয় না; বরং সঠিক ক্ষেত্র নির্বাচন, উপযুক্ত চুক্তিকাঠামো এবং কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সফলতার মূল শর্ত।

পিপিপি কোথায় সবচেয়ে কার্যকর

যেসব ক্ষেত্রে সরকারের অবকাঠামো রয়েছে কিন্তু সেবা প্রদান, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বা জনবল ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা বিদ্যমান, সেখানে পিপিপি সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। এর একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, বিশেষ করে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। চর, হাওর, উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলের অনেক প্রতিষ্ঠান জনবলসংকট ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব কেন্দ্র পরিচালনা করলে সেবার প্রাপ্যতা ও ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

সরকারি হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক সেবার ক্ষেত্রেও পিপিপি অত্যন্ত উপযোগী। ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি, ইমেজিং সেবা, ওষুধ বিতরণ, অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো সেবাগুলোর জন্য বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং উচ্চমাত্রার পরিচালন দক্ষতা প্রয়োজন, যা উপযুক্ত চুক্তির আওতায় বেসরকারি খাত অধিক কার্যকরভাবে প্রদান করতে পারে।

অবকাঠামো উন্নয়নও পিপিপির আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। বিশেষ করে ক্যানসার চিকিৎসা, পুনর্বাসন সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। পিপিপির মাধ্যমে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও পরিচালনা করা সম্ভব, একই সঙ্গে সরকারি তদারকি ও সেবার সামর্থ্য নিশ্চিত করা যায়।

সংক্ষেপে সরকারি মালিকানা বজায় রেখে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সেবার ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা উন্নত করার প্রয়োজন হলে পিপিপি সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।

স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং কোথায় সবচেয়ে কার্যকর

যেসব ক্ষেত্রে সরকারি খাতের সক্ষমতা চাহিদা পূরণে অপর্যাপ্ত, অথচ বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষতা বিদ্যমান, সেখানে স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং সবচেয়ে উপযোগী।

বাংলাদেশে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে প্রসবসেবা, স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিংয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ, এটি জীবন রক্ষাকারী ও সময়–সংবেদনশীল একটি সেবা, যা সরাসরি মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে প্রসবসেবা পরিবারের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবসেবা বৃদ্ধি, ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক সুরক্ষা প্রদানের জন্য এটি সরকারি অর্থায়নের একটি আদর্শ ক্ষেত্র।

ক্যানসার চিকিৎসা স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিংয়ের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলো ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। নতুন ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণ ও বিশেষজ্ঞ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ এবং দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এ অবস্থায় সরকার স্বীকৃত বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের জন্য ক্যানসার সেবা ক্রয় করতে পারে।

ডায়ালাইসিস সেবাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দেশে ডায়ালাইসিসের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, অথচ অধিকাংশ জেলায় সরকারি সক্ষমতা সীমিত। স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিংয়ের মাধ্যমে রোগীরা যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি ছাড়াই সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

জরুরি চিকিৎসাসেবাও এ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট, জরুরি বিভাগ এবং ট্রমা কেয়ার সুবিধা রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সহজলভ্য। স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং জরুরি পরিস্থিতি ও দুর্যোগকালে জীবন রক্ষাকারী সেবার দ্রুত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পারে।

এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বৃহৎ মহানগরীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সেবা, কার্ডিয়াক স্টেন্ট স্থাপনসহ অন্যান্য উচ্চব্যয়ী বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের কোথা থেকে শুরু করা উচিত

যদি বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়াতে চায়, তাহলে এমন উদ্যোগ দিয়ে শুরু করা উচিত, যা তুলনামূলকভাবে সহজ, রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং দ্রুত ও পরিমাপযোগ্য ফলাফল দিতে সক্ষম।

পিপিপির ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক সেবা সবচেয়ে যৌক্তিক সূচনা হতে পারে। ডায়াগনস্টিক সেবা সহজে সংজ্ঞায়িত, পরিমাপ, পর্যবেক্ষণ ও চুক্তিবদ্ধ করা যায়। এতে হাসপাতাল পরিচালনা কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না, অথচ সেবার মান উন্নয়ন এবং রোগীর সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করা সম্ভব।

এ মডেলে চুক্তিবদ্ধ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব যন্ত্রপাতি ও জনবল ব্যবহার করে সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সব প্যাথলজি ও ইমেজিং সেবা পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব নেবে। সরকার কেবল প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি ও সেবার স্থান প্রদান করবে। সেবার মূল্য সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। রোগীরা বর্তমান নির্ধারিত ফি-ই প্রদান করবে এবং ধার্যকৃত মূল্যের সঙ্গে রোগীর প্রদত্ত অর্থের পার্থক্য সরকার ভর্তুকি হিসেবে বহন করবে।

স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিংয়ের ক্ষেত্রে সরকারের উচিত এমন উচ্চ অগ্রাধিকার সেবা দিয়ে শুরু করা, যেখানে সরকারি সক্ষমতা স্পষ্টভাবে অপর্যাপ্ত। প্রসবসেবা, ক্যানসার চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা এ মানদণ্ড পূরণ করে। এসব সেবা পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে এবং তালিকাভুক্ত বেসরকারি সেবাদাতার কাছ থেকে সেবা ক্রয়ের মাধ্যমে দ্রুত সেবার পরিধি বৃদ্ধি ও রোগীর আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

তবে এ ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া অপরিহার্য। ছোট পরিসরে শুরু করে বাস্তবায়ন থেকে শিক্ষা নিতে হবে, নিয়ন্ত্রক ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সেবায় সম্প্রসারণ করতে হবে। পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ছাড়া বৃহৎ পরিসরে পিপিপি বা স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং বাস্তবায়নের চেষ্টা অতীতের সীমাবদ্ধতাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। এ উদ্দেশ্যে ‘ন্যাশনাল হেলথ অথরিটি’ বা ‘জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল’ নামে একটি শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার মাধ্যমে পিপিপি ও স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং কার্যক্রমের অর্থায়ন, চুক্তি ব্যবস্থাপনা, ক্রয়, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

স্বাস্থ্যসেবার বেসরকারীকরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়; বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত জনস্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জনের জন্য বেসরকারি খাতের সক্ষমতাকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগানো। যথাযথ পরিকল্পনা, চুক্তি ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পিপিপি এবং স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা, গুণগত মান, দক্ষতা এবং আর্থিক সুরক্ষা বৃদ্ধির শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে এবং বাংলাদেশকে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের পথে আরও এগিয়ে নিতে পারে।

● ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস, বাংলাদেশ