নবজাতকের মৃত্যু: অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ভয়াবহতা ও করণীয়
নবজাতকের মৃত্যু: অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ভয়াবহতা

একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ তাহার শিশুদের সুষ্ঠুভাবে বাড়িয়া উঠার মধ্যে নিহিত থাকে। অথচ সেই নিষ্পাপ নবজাতকরাই যদি জন্মের পরপর মৃত্যুর মুখে পতিত হয়, তাহা হইলে তাহা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নহে, বরং হইয়া ওঠে সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক। রাজশাহী মেডিক্যাল হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন জনৈক মানিক উদ্দিনের যমজ নবজাতকের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করিবার সংবাদ নিছক একটি চিকিৎসা-সংকট নহে; ইহা এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস।

স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা

স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ ও জীবনের আহ্বানে মা-বাবা স্নেহ করিয়া তাহাদের নাম রাখিয়াছিলেন মানিক-১ ও মানিক-২: অথচ সেই মানিকজোড় চলিয়া গেল খেয়ালের ভুলে। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার যুগেও যদি একজন নবজাতকের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কার্য না করে, তাহা হইলে প্রশ্ন উঠিতেই পারে—আমরা কোথায় দাঁড়াইয়া আছি? এই প্রশ্নের উত্তর আজ সত্যিই খুঁজিয়া দেখা দরকার।

অ্যান্টিবায়োটিক অপব্যবহারের ভয়াবহতা

বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ভয়াবহতা নূতন কোনো সংবাদ নহে। সাধারণ সর্দি, জ্বর কিংবা সামান্য সংক্রমণেও মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকেই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করিতেছে। বহু ফার্মেসি প্রেসক্রিপশন ছাড়াই দেদার ঔষধ বিক্রি করিতেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রোগী সুস্থ হইবার পূর্বেই ঔষধ বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়, যাহার কারণে জীবাণুগুলি ধীরে ধীরে প্রতিরোধী হইয়া উঠে। ফলে একসময় যেই ঔষধে রোগ সারিত, তাহাই হন্তারক হইয়া উঠিতেছে—যাহার নির্মম পূর্বাভাস এই মানিক ভাতৃদ্বয়ের মৃত্যু।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহু পূর্ব হইতেই অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার লইয়া সতর্ক করিয়া আসিতেছে। সংস্থাটির স্পষ্ট বার্তা হইল, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে বিশ্ব 'পোস্ট-অ্যান্টিবায়োটিক যুগে' প্রবেশ করিতে পারে, যেইখানে সাধারণ জ্বর, ক্ষত বা ছোটখাটো সংক্রমণেও মানুষের মৃত্যু হইবে। সংস্থাটির ভাষায়, 'যেই সংক্রমণ একসময় সহজে সারানো যাইত, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের কারণে তাহা আবার প্রাণঘাতী হইয়া উঠিতেছে।'

নীরব মহামারি

বিশেষজ্ঞদের বড় উদ্বেগ হইল, মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশু ও পোলট্রিতেও নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বাড়িতেছে, গবেষকরা যাহাকে 'নীরব মহামারি' বলিয়া অভিহিত করিতেছেন। উন্নত বিশ্ব এই সংকটকে অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত মোকাবিলা করিতেছে বটে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট প্রেসক্রিপশন ছাড়া অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। বিভিন্ন হাসপাতালে চালু রহিয়াছে 'অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপ'-এর ন্যায় বিশেষ ব্যবস্থাপনা, যেইখানে কোন রোগীর জন্য কোন ঔষধ কতদিন ব্যবহার হইবে, তাহা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি

অন্যদিকে, আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছে, যেইখানে 'শেষ অস্ত্র' হিসাবে ব্যবহৃত কার্বাপেনেম জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক পর্যন্ত অকার্যকর হইয়া পড়িতেছে। ইহাতে সবচাইতে বেশি ঝুঁকিতে রহিয়াছে নবজাতক, বয়স্ক ব্যক্তি ও আইসিইউ রোগীরা। শোচনীয় অবস্থা আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও। ভারতীয় চিকিৎসকরা বলিতেছেন, এমন রোগীর সংখ্যা বাড়িতেছে, যাহাদের শরীরে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। কিছু ক্ষেত্রে 'প্যান-রেজিস্ট্যান্ট' জীবাণু পাওয়া যাইতেছে; অর্থাৎ, প্রায় কোনো ঔষধই আর কার্যকর নহে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গিয়াছে, বাংলাদেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা ৭৯ হইতে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাইয়াছে; বিশেষত, আইসিইউতে সংক্রমণ সৃষ্টিকারী কিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে 'শেষ ভরসা' অ্যান্টিবায়োটিকও প্রায় অকার্যকর হইয়া পড়িতেছে।

করণীয়

এমতাবস্থায়, বাংলাদেশকেও এখন আর দায় এড়াইবার সুযোগ নাই। সরকারকে ঔষধ বিক্রয়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করিতে হইবে। হাসপাতালগুলিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আধুনিক করিতে হইবে। বাড়াইতে হইবে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা। সবচাইতে জরুরি হইল, ফার্মেসিগুলির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমাদের বুঝিতে হইবে—অ্যান্টিবায়োটিক কোনো সাধারণ ঔষধ নহে, ইহা মানবসভ্যতার অস্তিত্বরক্ষার অন্যতম হাতিয়ার।

ভবিষ্যৎ সতর্কতা

অর্থাৎ, আজ যদি আমরা ইহার অপব্যবহার বন্ধ করিতে ব্যর্থ হই, তাহা হইলে আগামী প্রজন্মের জন্য পৃথিবী হইয়া উঠিবে এমন এক জায়গা, যেইখানে সামান্য সংক্রমণও পরিণত হইবে মৃত্যুদণ্ডে! প্রখ্যাত ব্রিটিশ চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠ ডেম স্যালি ডেভিস যেমনটি বলিয়াছেন, 'অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ না করিলে গোটা আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাই একদিন ভাঙিয়া পড়িবে।'