হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যু বেড়েছে, টিকা দিতে অনীহা অভিভাবকদের
হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যু বেড়েছে, টিকা দিতে অনীহা

প্রতীকী ছবিপ্রথম আলোশিশুরা ঠিকমতো টিকা না পাওয়ায় দেশে আবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে এই রোগে সাড়ে তিনশোর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরিভাবে দেশব্যাপী হামের টিকা দিচ্ছে সরকার। এরপরও শিশুদের সুরক্ষায় টিকা দিতে অনীহা জানাচ্ছেন কিছু অভিভাবক। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। সন্তানের জীবন বাঁচাতে টিকা দেওয়াটা জরুরি—এই বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সচেতনতা সৃষ্টির প্রচার চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সন্তানকে টিকা দিতে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোবাইলে বিভিন্ন ভিডিও দেখে, আশপাশের মানুষের কথা শুনে এবং টিকা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যে প্রভাবিত হয়ে তাঁরা সন্তানদের টিকা দিচ্ছেন না।

অভিভাবকদের ভুল ধারণা

আজ রোববার রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকার ৫১৬ নম্বর গাজী বস্তিতে গিয়ে এমন কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। সানোয়ার হোসেন নামে এক অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি অনেকগুলো ভিডিও দেখছি মোবাইলে যে অনেক দিকে বাচ্চারা মারা গেছে। চিটাগাং, খুলনার ওই দিকে আরকি, অনেক বাচ্চা মারা গেছে, অনেক দিকেই দেখছি। এই জন্য আমি টিকাটা দিতে আগ্রহী না আরকি।’ এ কারণে সাত মাস বয়সী শিশুসন্তান আয়েশা মনিকে টিকা দেননি বলে জানালেন তিনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সানোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বলা শেষ হওয়ার মুহূর্তে বাসায় আসেন তাঁর স্ত্রী পলি আক্তার। তিনিও বলেন, সন্তান অসুস্থ হবে—এই ভয় থেকে আয়েশাকে টিকা দেননি। পলি আক্তার বলেন, ‘অনেক মাইনষে কয়, টিকা দিলে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে যায়, এ জন্য দিছি না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বস্তিতে টিকা না দেওয়ার প্রবণতা

গাজী বস্তিতে প্রায় এক শ পরিবার বসবাস করে। এই বস্তি ঘুরে ১ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১০টি শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। সুমাইয়া বেগম (২০) নামে আরেক অভিভাবক বলেন, টিকা দিলে সাইড ইফেক্ট (পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া) হয়, সে জন্য নিজের দেড় বছর বয়সী সন্তান ইসরাত জাহান ও ৪ বছর বয়সী ইব্রাহিমকে হামের টিকা দেননি।

ইসরাত মাঝেমধ্যে অসুস্থ থাকায় টিকা দিতে তার বাবা জাহিদ হোসেন নিষেধ করেছেন বলেও জানান সুমাইয়া আক্তার। টিকা না পাওয়া অনেক শিশু হামে আক্তান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে—এটা জানেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এই নারী বলেন, ‘ভয় তো কিছুটা আছে। যেহেতু বাচ্চার বাবা না করতেছে, তাই এখন তো আর দিতে পারমু না। এখনো টিকা দিতে না করতাছে।’

শারীরিক সমস্যার কারণে টিকা না দেওয়া

শিশু আদিল হাসানের (৫) শরীরে চর্মরোগ থাকায় তাকে হামের টিকা দেননি বলে জানান শিশুটির মা হালিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘ভাবছি, টিকা দিলে যদি আবার চুলকানি বেড়ে যায়। সে জন্য আর দেওয়া হয়নি।’ হামে শিশুদের মৃত্যু দেখে কোনো ভয় কাজ করছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, তেমন ভয় নেই।’

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের উদ্বেগ

টিকা নিয়ে তাঁদের এই ভুল ধারণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভুল ধারণা থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ, যে অভিভাবকেরা পত্রিকা পড়েন না, টেলিভিশন দেখেন না তাঁদের না জানাটা দোষের কিছু না। সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণকে জানানো। এই সচেতনতা তৈরির জন্য শিক্ষক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, ধর্মীয় নেতাদের দিয়ে সরকারকে প্রচারণা চালাতে হবে।’

সচেতন অভিভাবকের উদাহরণ

অবশ্য গাজী বস্তিতে টিকা সম্পর্কে সচেতন অভিভাবকদেরও পাওয়া গেছে। তাঁদের একজন সুমাইয়া আক্তার (২২) জানালেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামের প্রকোপ বাড়ার পর যখন দেখেন চারদিকে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, তখন নিজের একমাত্র সন্তান আনাসকে (৪) কিছুদিন আগে টিকা দিয়ে এনেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে এতটা খেয়াল করিনি। কিছু টিকা দিয়েছি, হামের টিকা দিয়েছি কি না জানি না। এখন কিছুদিন আগে দিলাম। মনে যে ভয় ছিল সেটা কিছুটা কমেছে।’

সাড়ে ৪ বছর বয়সী শিশু সামিয়া আক্তারকেও কিছুদিন আগে টিকা দিয়েছেন বলে জানালেন তার মা শেফালি বেগম। তিনি জানান, শুরুতে কিছু টিকা দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন হামের টিকা দিয়েছেন কি না মনে নেই। তাই কয়েক দিন আগে স্থানীয় বাগিচা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে সন্তানকে টিকা দেন।

প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুনবাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুনশিশুহামমৃত্যুস্বাস্থ্যটিকা