এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা: ১৯১৬ সালের সেই রহস্যময় ঘুমের রোগের অজানা ইতিহাস
এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা: রহস্যময় ঘুমের রোগের ইতিহাস

এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা: ১৯১৬ সালের সেই রহস্যময় ঘুমের রোগের অজানা ইতিহাস

১৯১৬ সালের শীতকাল। ইউরোপজুড়ে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে চলেছে। কিন্তু সেই যুদ্ধের আতঙ্কের মধ্যেই আরেকটি অদৃশ্য শত্রু নিঃশব্দে হানা দিতে শুরু করে। ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির পাশাপাশি আবির্ভূত হয় এক অদ্ভুত নতুন রোগ, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা বা ঘুমের রোগ নামে পরিচিতি পায়।

ভিয়েনার ডাক্তার ও অদ্ভুত রোগীদের সম্মুখীন

ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রিক-নিউরোলজিক্যাল ক্লিনিকে কাজ করতেন ডাক্তার কনস্ট্যান্টিন ভন ইকোনোমো। তাঁর কাছে একের পর এক রোগী আসতে শুরু করে অদ্ভুত সব লক্ষণ নিয়ে। কারও মেনিনজাইটিসের মতো লক্ষণ, কারও প্রলাপ বকছেন, কিন্তু কোনো পরিচিত রোগের সঙ্গেই এগুলো মিলছিল না। সব রোগীর মধ্যে একটি সাধারণ লক্ষণ ছিল প্রচণ্ড ঘুম বা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। ডাক্তার ইকোনোমো বুঝতে পারেন, এটি সাধারণ কোনো রোগ নয় এবং তিনি এর নাম দেন এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা।

রোগের ভয়াবহ প্রকৃতি ও লক্ষণসমূহ

এই রোগের আক্রমণ ছিল অনেকটা ভৌতিক কাহিনীর মতো। শুরুতে সাধারণ ফ্লুর মতো মনে হতো:

  • হালকা জ্বর
  • মাথা ব্যথা
  • কাঁপুনি
  • বমি ভাব

কিন্তু এরপরই শুরু হতো আসল আতঙ্ক। ২০১৭ সালের এক গবেষণাপত্রে উল্লিখিত এক কিশোরীর ঘটনায় দেখা যায়, সে হঠাৎ শরীরের একপাশ অবশ অনুভব করে এবং আধা ঘণ্টার মধ্যে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। ঠিক ১২ দিন পর ঘুমের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

জীবন্ত ভূত থেকে জম্বি: রোগের ভিন্ন রূপ

এই রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি ছিল সমিনোলেন্ট-অফথালমোপ্লিজিক। এতে আক্রান্ত রোগীরা অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমাত। তাদের ডেকে তোলা যেত, তারা জেগে কথাও বলত, কিন্তু তাদের ভেতরে কোনো প্রাণশক্তি থাকত না। বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট অলিভার স্যাক্স তাঁর অ্যাওয়েকেনিংস বইয়ে এই রোগীদের বর্ণনা দিয়েছেন মর্মান্তিক ভাষায়। তিনি লিখেছেন, 'তারা সচেতন ছিল, কিন্তু পুরোপুরি জাগ্রত নয়। তারা সারাদিন চেয়ারে বসে থাকত নিশ্চল, নির্বাক হয়ে। তাদের কোনো এনার্জি ছিল না, কোনো ইচ্ছে ছিল না, কোনো ক্ষুধা বা আবেগ ছিল না। তারা ছিল ভূতের মতো অশরীরী।'

যন্ত্রণার নতুন রূপ ও ভ্যারিয়েন্ট

কোভিড-১৯ এর মতো এই রোগেরও নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট দেখা দিতে শুরু করে। ১৯১৯-২০ সালের দিকে ইতালি ও সুইডেনে এক নতুন ধরনের এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা ছড়িয়ে পড়ে। এবার শুধু ঘুম নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইনসোমনিয়া ও প্রচণ্ড ব্যথা। রোগীদের শরীরে দেখা দিত অদ্ভুত খিঁচুনি:

  1. হাত-পা বেঁকে যাওয়া
  2. পেটের পেশি লাফালাফি করা
  3. চোখের পাতা এক করতে না পারা
  4. শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া

রহস্যময় অন্তর্ধান ও পারকিনসন্সের যোগসূত্র

যাঁরা এই রোগের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের ভোগান্তি সেখানেই শেষ হয়নি। কয়েক বছর পর তাঁদের শরীরে দেখা দিতে শুরু করে পারকিনসন্স রোগের মতো লক্ষণ। ধারণা করা হয়, পরবর্তী সময়ে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্তদের প্রায় ৫০ শতাংশই ছিলেন এই ঘুমের রোগ থেকে বেঁচে ফেরা মানুষ।

রোগের উৎস ও রহস্যময় অন্তর্ধান

এই রোগ এল কোথা থেকে? আর গেলই বা কোথায়? তৎকালীন অনেক বিজ্ঞানী ভাবতেন, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু ভাইরাসের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে। কিন্তু আমেরিকার বিভিন্ন শহরের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফ্লু এবং এই ঘুমের রোগের মধ্যে সরাসরি কোনো মিল নেই। আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনে হয়তো এন্টেরোভাইরাস গোত্রের কোনো ভাইরাসের হাত ছিল। পোলিও ভাইরাসও এই গোত্রের।

১৯১৬ থেকে শুরু হয়ে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়ানোর পর, প্রায় ৫ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়ে এই রোগটি হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যায়। যেন কোনো জাদুবলে পৃথিবী থেকে মুছে যায় এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা।

ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা

রোগটি চলে যাওয়া অবশ্যই খুশির খবর। কিন্তু ভয়ের ব্যাপার হলো, আমরা জানি না কেন এটি হয়েছিল বা কেনই বা চলে গেল। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, যতক্ষণ না এর সঠিক কারণ জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না যে ভবিষ্যতে কোনো এক ফ্লু মহামারির হাত ধরে এই ঘুমের অভিশাপ আবারও ফিরে আসবে কি না। আবার যদি ফিরে আসে, তবে আধুনিক বিজ্ঞান কি পারবে মানুষকে এই রোগের হাত থেকে বাঁচাতে? উত্তরটা সময়ের হাতেই তোলা থাক।