শীতকালে হাত-পা ঠান্ডা লাগার কারণ ও প্রতিকার: চিকিৎসকদের বিশ্লেষণ
হাত-পা ঠান্ডা লাগার কারণ ও প্রতিকার

শীতকালে হাত-পা ঠান্ডা লাগার কারণ ও প্রতিকার: চিকিৎসকদের বিশ্লেষণ

চারপাশের সবাই যখন স্বাভাবিক তাপমাত্রায় স্বচ্ছন্দে আছেন, তখন আপনার হয়তো হাত–পা বরফের মতো ঠান্ডা লাগছে। এটি শুধু অস্বস্তিকর নয়, বরং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিতও দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলেও কিছু মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক বেশি ঠান্ডা থাকে।

১. শরীরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য

কেউ কেউ বলেন, ‘আমার শরীর এমনিতেই ঠান্ডা।’ ব্যাপারটা আদতেই সত্য হতে পারে। এর অন্যতম কারণ হতে পারে কম পেশি বা মাসল মাস। পেশি শরীরে তাপ তৈরি করতে সাহায্য করে। যাঁদের পেশি কম, তাঁদের শরীর তাপ সংরক্ষণের জন্য হাত–পা থেকে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। ফলে হাত-পা ঠান্ডা লাগে, কখনো পুরো শরীরও। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের পেশি তুলনামূলক কম হয়, তাই তাঁদের মধ্যে ঠান্ডা লাগার প্রবণতাও বেশি দেখা যায়।

২. পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া

ঘুম কম হলে শুধু ক্লান্তি নয়, ঠান্ডাও বেশি লাগতে পারে। শরীরের নিজস্ব ‘বডি ক্লক’ বা সার্কাডিয়ান রিদম ঘুমের সময় শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। আপনি যদি নিয়মিত কম ঘুমান, তাহলে দিনের বেলায়ও শরীর ধরে নিতে পারে বিশ্রামের সময় চলছে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় ঠান্ডা বেশি অনুভূত হয়।

৩. রক্ত সঞ্চালন দুর্বল হওয়া

রক্ত ঠিকমতো সঞ্চালিত না হলে শরীরের বিভিন্ন অংশে তাপ পৌঁছায় না। সাধারণত হাত ও পা তখন বেশি ঠান্ডা লাগে। ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস—এসব কারণে রক্ত সঞ্চালন দুর্বল হতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার ও ধূমপান ত্যাগ করলে রক্তপ্রবাহ উন্নত হয়।

৪. দ্রুত ওজন কমে যাওয়া

হঠাৎ ওজন কমলে বেশি ঠান্ডা লাগতে পারে। কারণ, ত্বকের নিচে থাকা চর্বি শরীরকে উষ্ণ রাখে। ওজন কমার সঙ্গে সঙ্গে এই ‘ইনসুলেশন’ কমে যায়। এ ছাড়া খুব কম ক্যালরি গ্রহণ করলে শরীর শক্তি বাঁচাতে বিপাকক্রিয়া ধীর করে দেয়। এর ফলেও সব সময় ঠান্ডা লাগে।

৫. ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি

ভিটামিন বি১২ স্নায়ুতন্ত্র ও রক্তকণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর অভাবে রক্তস্বল্পতা হতে পারে, যার একটি উপসর্গ হলো ঠান্ডা লাগা। বিশেষ করে নিরামিষভোজী, বয়স্ক মানুষ, হজমজনিত সমস্যা আছে, এমন ব্যক্তি কিংবা যাঁদের অন্ত্রের অস্ত্রোপচার হয়েছে, তাঁদের মধ্যে এ ঘাটতির ঝুঁকি বেশি। লক্ষণগুলো হতে পারে দুর্বলতা, ক্লান্তি, ক্ষুধামান্দ্য, ওজন কমে যাওয়া, হাত-পায়ে ঝিনঝিন বা অবশভাব এবং সব সময় ঠান্ডা লাগা।

৬. থাইরয়েডের সমস্যা (হাইপোথাইরয়েডিজম)

থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের শক্তি ব্যবহারের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। এই গ্রন্থি কম কাজ করলে শরীরের বিপাক ধীর হয়ে যায়, ফলে ঠান্ডা লাগা অন্যতম উপসর্গ হয়ে দাঁড়ায়। নারী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি ও যাঁদের আগে থাইরয়েডজনিত সমস্যা ছিল, তাঁদের ঝুঁকি বেশি।

৭. রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)

রক্তে পর্যাপ্ত লোহিত কণিকা না থাকলে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছায় না। ফলে হাত-পা ঠান্ডা লাগতে পারে। অন্তঃসত্ত্বা নারী, অতিরিক্ত মাসিক রক্তক্ষরণ হয় যাঁদের কিংবা আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি আছে, তাঁদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।

৮. রক্তনালির রোগ

দুটি রোগ বিশেষভাবে ঠান্ডা লাগার সঙ্গে জড়িত—পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ (পিএডি): ধমনিতে চর্বি জমে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে এ সমস্যা হয়। এতে হাত বা পায়ে ঠান্ডা, ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। রেনোডস ডিজিজ: এতে ঠান্ডা বা মানসিক চাপের সময় আঙুল ও পায়ের আঙুলে রক্তপ্রবাহ হঠাৎ কমে যায়। ফলে সেসব সাদা বা নীলচে হয়ে ঠান্ডা লাগে।

৯. ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিসে স্নায়ু ও রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। ফলে হাত-পায়ে ঝিনঝিন, অবশভাব ও ঠান্ডা অনুভূত হয়।

সব সময় ঠান্ডা লাগলে কী করবেন

প্রথম কাজ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। কারণ, এর পেছনে কোনো রোগ আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। চিকিৎসকের মতে, যদি সমস্যাটি কোনো রোগজনিত হয়, তাহলে সাধারণত অন্য উপসর্গও দেখা দেয়। তবু সন্দেহ হলে পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে ভালো। এ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনে কিছু অভ্যাস গড়ে তুললে ঠান্ডা লাগা অনেকটাই কমানো সম্ভব—

  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন: শরীর গরম রাখে ও রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
  • স্তরে স্তরে পোশাক পরুন: একাধিক স্তরের কাপড় তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
  • গরম সেঁক নিন: হাত-পা বা শরীরের নির্দিষ্ট অংশ গরম রাখতে কাজে দেয়।
  • পর্যাপ্ত ঘুমান: ঘুমের ঘাটতি ঠান্ডা লাগার বড় কারণ হতে পারে।
  • পুষ্টিকর খাবার খান: ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি দূর হলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
  • ধূমপান কমান বা ছাড়ুন: এটি রক্তনালির ক্ষতি করে ও ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি বাড়ায়।

সূত্র: রিয়াল সিম্পল