ভালোবাসা দিবসে অক্সিটোসিন হরমোনের বিশেষ গুরুত্ব
আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এই বিশেষ দিনে আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের ভালোবাসতে ও বন্ধন গড়তে সহায়তা করে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এই উপাদানের নাম অক্সিটোসিন, যা সাধারণ মানুষের কাছে লাভ হরমোন হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকদের মতে, অক্সিটোসিন কেবল রোমান্টিক অনুভূতির সাথেই যুক্ত নয়; বরং এটি মানুষের সামাজিক বন্ধন, বিশ্বাস ও মানসিক প্রশান্তির একটি শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
অক্সিটোসিন কী এবং কীভাবে কাজ করে?
অক্সিটোসিন হলো একটি প্রাকৃতিক হরমোন, যা আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে উৎপন্ন হয়ে পিটুইটারি গ্রন্থির মাধ্যমে রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে। এন্ডোরফিন বা সেরোটোনিনের মতোই এটি শরীরে ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টি করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রধান কাজ হলো সন্তান প্রসবের প্রক্রিয়াকে সহজ করা এবং প্রসবের পর মা ও শিশুর মধ্যে নিবিড় বন্ধন গড়ে তোলা। মূলত দ্রুত প্রসব করানোর ক্ষমতার কারণেই এর নাম অক্সিটোসিন রাখা হয়েছে, যদিও এর নামকরণের ইতিহাস নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে চমকপ্রদ বিতর্ক রয়েছে।
অক্সিটোসিন নামকরণের মজার ইতিহাস
নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী রজার গুইলেমিনের মতে, ইংরেজি অক্সিটোসিন বানানটি আসলে একটি ভুল অনুবাদের ফল হতে পারে। গ্রিক শব্দ অসি মানে দ্রুত এবং টোকোস মানে জন্ম নেয়া। সেই হিসেবে এর নাম হওয়া উচিত ছিল অসিটোসিন। একটি মজার লোকগাথা প্রচলিত আছে এই হরমোন নিয়ে। যখন এই হরমোন প্রথমবারের মতো ষাঁড় থেকে পৃথক করা হয়েছিল, তখন এর আবিষ্কারক ভিনসেন্ট ডু ভিগনিউড মজা করে বলেছিলেন, ব্যাকরণ যা-ই হোক না কেন, এটি যেহেতু ষাঁড় থেকে এসেছে, তাই আমার কাছে এটি অক্সিটোসিন! ষাঁড়ের ইংরেজি শব্দ অক্স বলে এমন নামকরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
শরীরে অক্সিটোসিনের কার্যকারিতা ও প্রভাব
অক্সিটোসিন শরীরে পজিটিভ ফিডব্যাক লুপ হিসেবে কাজ করে। এই হরমোন এমন একটি কাজ শুরু করে, যা এর নিঃসরণ আরও বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ:
- এটি জরায়ুর সংকোচন বাড়িয়ে প্রসব ত্বরান্বিত করে।
- প্রসবের পর স্তন দুগ্ধ নিঃসরণে সাহায্য করে।
- নবজাতকের কান্নার শব্দ বা স্পর্শে মায়ের মস্তিষ্কে আরও অক্সিটোসিন নির্গত হয়, যা মা ও শিশুর টান বাড়িয়ে দেয়।
গবেষণায় অক্সিটোসিনের সুফল
গবেষণায় দেখা গেছে, অক্সিটোসিন মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। এটি মানুষের মধ্যে সামাজিক মেলামেশার আগ্রহ বাড়ায় এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে সহায়তা করে। শরীরে অক্সিটোসিনের মাত্রা কম থাকলে বিষণ্নতা, বিশেষ করে সন্তান প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে।
কীভাবে অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়ানো যায়?
ব্যায়ামের মাধ্যমে লালারসে অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়ে। দলবদ্ধভাবে গান গাইলে বা গান শুনলে মানুষের মধ্যে বন্ধন তৈরি হয়, তখনো অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয়। আবার কাউকে জড়িয়ে ধরা, ম্যাসাজ নেওয়া বা প্রিয়জনের হাত ধরে রাখার মতো অতি সাধারণ কাজগুলো শরীরে শান্তির অনুভূতি নিয়ে আসে। অন্যের সঙ্গে ভালো ব্যবহার বা পরোপকার করলেও মস্তিষ্ক থেকে এই সুখী হরমোন নিঃসৃত হয়।
সূত্র: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
