হামে ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত্যু ৫২৮
হামে ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু, মোট ৫২৮

হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এটি হামে এক দিনে মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে ৪ মে এক দিনে সর্বোচ্চ ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে মৃত্যু হয়েছে ৮৬ জনের। আর হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪৪২ জনের। এ নিয়ে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২৮ জনে। আক্রান্তও হচ্ছে প্রতিদিন হাজারের উপরে। ২০ মে টিকা দেওয়ার একমাস পূর্ণ হলেও কমছে না হামে আক্রান্ত ও মৃত্যু।

চিকিৎসা ব্যয়ে নাজেহাল পরিবার

হামে আক্রান্ত শিশুদের প্রত্যেককে কম করে হলেও ছয় দিন থাকতে হচ্ছে হাসপাতালে, আর হামের জটিলতা থাকলে সে ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় থাকছে হচ্ছে হাসপাতালে। ফলে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে এসেছেন তানজিনা তার ১৫ মাস বয়সি সন্তান জোবায়েরকে নিয়ে। তারা ১৯ মে এসে ভর্তি হন রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে। বাচ্চার সর্দি জ্বর, ঠান্ডা লাগা, শ্বাসকষ্ট, পাতলা পায়খানা, হাম নিয়ে মাইজদি হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখানকার ডাক্তার আমাদের এই হাসপাতালের নাম দিয়া পাঠিয়ে দেয়। মা তানজিলা বলেন, ‘আমরা বাচ্চাকে অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ অ্যাম্বুলেন্সে করে এসে এই হাসপাতালে ভর্তি করাই। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়েছে ৫ হাজার টাকা। আর এই হাসপাতালে আজ পাঁচ দিন আছি, প্রতিদিন খরচ লাগছে—না হলেও ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। আরও চারটা টেস্ট বাকি আছে বলে জানান। শিশুটির বাবা আবুল কাশেম পেশায় একজন কাভার্ড ভ্যান চালক। তিনি খুলনায় গাড়ি চালান, অসুস্থ ছেলের চিকিৎসা জন্যে টাকার যোগান দিতে গিয়ে ছেলেকে দেখতে আসা হয়নি তার। তানজিনা বলেন, এই হাসপাতালে আসার পর থেকে সবই কিনতে হচ্ছে, ক্যানোলা থেকে শুরু করে ওষুধ—সব বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে, টেস্টগুলো এই হাসপাতালে করাতে পেরেছি কিন্তু টাকা দিতে হয়েছে। এত টাকা কি আমাদের আছে? বাচ্চার বাপে ধার-দেনা করে পাঠাচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জরিপে চিকিৎসা ব্যয়ের চিত্র

সম্প্রতি মে মাসের ৭ তারিখ থেকে ১১ মে পর্যন্ত রাজধানীর একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে হামের আক্রান্ত শিশুর অভিভাবকদের চিকিত্সাব্যয় নিয়ে জরিপ চালায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এতে দেখা গেছে যে, সরকারি হাসপাতালে ছয় দিন থাকলে ব্যয় হয় সাড়ে ১২ হাজার টাকার কিছু বেশি। আর বেসরকারি হাসপাতালে এই ব্যয় আড়াইগুণ বেশি বলে জানা যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত খরচ আরও অনেক বেশি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিউমোনিয়ায় মৃত্যু, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা তৈরি করছে নিউমোনিয়া। এর পাশাপাশি সেকেন্ডারি ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। এডিনো ভাইরাল নিউমোনিয়া এবং বোকা ভাইরাল নিউমোনিয়া হচ্ছে। এতে বাচ্চাদের পুরো লাঙ্ক ড্যামেজ হয়ে যাচ্ছে। মিজন্সের কারণে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শিশুর ভ্যাকসিন দেওয়া নাই, অপুষ্টি আছে। অপুষ্টির জন্যে নিউমোনিয়াটা সিভিয়ার হচ্ছে। ফলে বাচ্চাগুলোকে কোনোভাবে আর বাঁচানো যাচ্ছে না। এই শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, বেশির ভাগ শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে। নরমাল নিউমোনিয়ায় যেমন অ্যান্টিবায়োটিক দিলে ভালো হয়ে যায়, কিন্তু মিজলসের পরে শিশুদের নিউমোনিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক রেসপন্স করছে না। আমরা ডাবল ডাবল অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছি, অনেক সময় সাপোটিকভাবে অন্য ওষুধও দিচ্ছি। তাতেও কাজ হয় না। চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, সরকারি হাসপাতালের চেয়ে একটু বেশি আমাদের শিশু হাসপাতালের ব্যয়। কারণ এটা তো সরকারি হাসপাতাল না। তাছাড়া আমাদের সাধ্যমতো ওষুধ থেকে শুরু করে বিনা মূল্যের বেড দেওয়া হচ্ছে। তবে গরিব রোগীদের জন্যে এই ব্যয় হয়তো বেশিই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালকের মন্তব্য

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, হামে এত মৃত্যু আসলে প্রত্যাশিত ছিল না এবং আমরা যতটুকু মনোযোগ দেওয়া দরকার ছিল, যতটা অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল, যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ, যন্ত্রপাতি দিয়ে এটাকে মোকাবিলা করা দরকার ছিল—সেটা আমরা করছি না। হয়তো অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটা অনেক পরে। সুতরাং এই দুঃখজনক মৃত্যুগুলো ঘটছে।

পরিসংখ্যান

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১৩০৬ জন। আর এ পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৮১৩ জন হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৮ জন হামের রোগী পাওয়া গেছে। এ নিয়ে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৬২২ জন। এছাড়া এ পর্যন্ত হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ৫৫৮ জন। আর ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে মোট ৪৬ হাজার ২১৪ জন।