যুক্তরাষ্ট্রের ডালান অ্যানিমেল হেলথের বিজ্ঞানীরা মৌমাছির জন্য টিকা তৈরি করেছেন এবং বর্তমানে গলদা চিংড়ির ওপর একই ধরনের প্রযুক্তি পরীক্ষা করছেন। এই টিকা অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের রোগ প্রতিরোধে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
অমেরুদণ্ডী প্রাণীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যেও এক ধরনের প্রশিক্ষিত প্রতিরোধক্ষমতা থাকে। অতীতে কোনো জীবাণুর সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতা তাদের জিনের ভেতরের রোগপ্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে এমনভাবে বদলে দেয়, যা পরবর্তী সময়ে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা প্রদান করে। এই পরিবর্তনের কিছু অংশ এপিজেনেটিক মেকানিজমের মাধ্যমে ঘটে এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও স্থানান্তরিত হতে পারে।
মৌমাছির টিকা: আমেরিকান ফাউলব্রুডের বিরুদ্ধে লড়াই
ডালান অ্যানিমেল হেলথের তৈরি এই টিকা মূলত আমেরিকান ফাউলব্রুড নামক একটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে। ডালান অ্যানিমেল হেলথের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এরিন স্ট্রেট বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হতো, কীটপতঙ্গকে টিকা দেওয়া অসম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।"
নতুন পদ্ধতিতে প্রতিটি মৌমাছিকে আলাদাভাবে ইনজেকশন দেওয়া হয় না। পরিবর্তে, নিষ্ক্রিয় ব্যাকটেরিয়ার অংশ মৌমাছির খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, যা শ্রমিক মৌমাছিরা গ্রহণ করে। শ্রমিক মৌমাছিরা এই খাবার প্রক্রিয়াজাত করে রয়্যাল জেলি তৈরি করে এবং তা রানি মৌমাছিকে খাওয়ায়। এই জেলি খাওয়ার ফলে ব্যাকটেরিয়ার কণাগুলো রানির ডিম্বাশয়ে পৌঁছায়। এর ফলে রানি মৌমাছি যে নতুন ডিম বা বাচ্চার জন্ম দেয়, তারা জন্মগতভাবেই এই মারাত্মক রোগের বিরুদ্ধে উচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, টিকাপ্রাপ্ত রানির লার্ভাগুলো এই রোগ সংক্রমণের হাত থেকে অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে।
গলদা চিংড়ির জন্য ভ্যাকসিন পরীক্ষা
বিজ্ঞানী নাইজেল সুইফট জানিয়েছেন, টিকা দেওয়ার পর মৌমাছির কলোনিতে ডিফর্মড উইং ভাইরাসের আক্রমণও অনেক কমে গেছে। মৌমাছির পর এবার ডালান অ্যানিমেল হেলথ গলদা চিংড়ির জন্য ভ্যাকসিন পরীক্ষা শুরু করেছে, যা বিশ্বজুড়ে অন্যতম একটি লাভজনক মৎস্য চাষ শিল্প। বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণে প্রতিবছর চিংড়ির খামারিদের কোটি কোটি টাকার লোকসান হয়, বিশেষ করে আর্লি মর্টালিটি সিন্ড্রোম এবং হোয়াইট স্পট সিন্ড্রোম ভাইরাসের কারণে।
মৌমাছির মতোই চিংড়ির এই ভ্যাকসিনও প্রাপ্তবয়স্ক প্রজননক্ষম চিংড়িকে খাবারের মাধ্যমে খাওয়ানো হয়। ফলে তাদের থেকে জন্ম নেওয়া পোনাগুলো শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড ভ্যাকসিন কংগ্রেসে এর প্রাথমিক ল্যাব পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এই ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও বিজ্ঞানীরা এখনই এটিকে চূড়ান্ত সফল বলতে নারাজ। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাস্টেসিয়ান সংক্রামক রোগ গবেষক অরুণ ধর বলেন, "গবেষণাগারের পরিবেশ এবং বাস্তব মাঠের পরিবেশ সব সময় এক হয় না। তাই এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনার আগে মাঠপর্যায়ের আরও তথ্য প্রয়োজন।"
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ডালান অ্যানিমেল হেলথ খুব শিগগির ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর ফিল্ড ট্রায়াল বা মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এই একই নীতি ভবিষ্যতে রেশম পোকা, ঝিনুক, কাঁকড়া এবং লবস্টারের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলজ ও কৃষিজ প্রাণীর রোগ প্রতিরোধে ব্যবহার করা যাবে। এই আবিষ্কার জীববিজ্ঞানের অন্যতম প্রাচীন একটি ধারণাকে ভেঙে দিয়ে প্রাণীর চিকিৎসায় এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।



