প্রিয়জন হারানোর পর কে পিজিডিতে আক্রান্ত হবে, মস্তিষ্ক স্ক্যানেই আগাম জানা যাবে
প্রিয়জন হারানোর বেদনা অত্যন্ত গভীর ও যন্ত্রণাদায়ক। এই শোকের তুলনা হয় না বললেই চলে। সময়ের সাথে সাথে অধিকাংশ মানুষের এই কষ্ট ধীরে ধীরে কমে আসে এবং তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। কিন্তু সবাই এই সুযোগ পায় না। প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ এই শোক কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারে না। তাদের ক্ষেত্রে সময়ের সাথে সাথে ব্যথা আরও তীব্র হতে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘প্রোলংড গ্রিফ ডিজঅর্ডার’ বা সংক্ষেপে পিজিডি।
পিজিডি কেন হয়? মস্তিষ্কের রহস্য উদঘাটন
২০২২ সালে আমেরিকার মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা পিজিডিকে একটি স্বতন্ত্র মানসিক রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন। তখন চারদিকে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কারণ, প্রিয়জন হারানোর পর শোক পাওয়া মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। একে রোগ বলা হবে কেন? শোক কাটিয়ে ওঠার কি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে? এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে বিজ্ঞানীরা মাঠে নামেন। তারা স্বাভাবিক শোক ও পিজিডি আক্রান্ত মানুষের মস্তিষ্কের স্ক্যান পরীক্ষা করেন। ফলাফল চমকপ্রদ: পিজিডি আসলে সাধারণ শোক নয়; এটি মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ আলাদা একটি অবস্থা।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের গবেষক রিচার্ড ব্রায়ান্ট একটি গবেষণা চালান। তিনি পিজিডি আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের সাথে বিষণ্নতা বা ট্রমা (পিটিএসডি) আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের তুলনা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, পিজিডি রোগীদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
মস্তিষ্কের কোন অংশগুলো জড়িত?
আমাদের মস্তিষ্কে নিউক্লিয়াস অ্যাকামবেন্স নামের একটি অংশ রয়েছে, যা আনন্দ, পুরস্কার বা মোটিভেশন নিয়ন্ত্রণ করে। পিজিডি রোগীদের এই অংশ অদ্ভুত আচরণ করে। মৃত মানুষের ছবি দেখলে বা মৃত্যু-সম্পর্কিত শব্দ শুনলে এই অংশ তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণত আনন্দদায়ক কিছু দেখলে এই অংশ সক্রিয় হয়, কিন্তু পিজিডি রোগীদের মস্তিষ্ক মৃত ব্যক্তির স্মৃতিতেই আটকে যায়। তারা অন্য কোথাও আনন্দ খুঁজে পায় না, ফলে মৃত মানুষটির জন্য তাদের ভেতরে এক তীব্র হাহাকার তৈরি হয়।
মস্তিষ্কের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অ্যামিগডালা ও ডান হিপোক্যাম্পাস, যা আবেগ ও স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা পিজিডি রোগীদের কবরস্থান বা মৃত্যু-সম্পর্কিত ছবি দেখালে এই অংশগুলো তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখানো হলে এই অংশগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এর অর্থ হলো, তাদের মস্তিষ্ক ইতিবাচক আবেগ অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং আবেগের পুরো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে।
পিজিডি ও পিটিএসডির পার্থক্য
পিটিএসডি রোগীরা সাধারণত মৃত মানুষের স্মৃতি থেকে পালাতে চান এবং সম্পর্কিত জিনিস এড়িয়ে চলেন। কিন্তু পিজিডি রোগীদের ক্ষেত্রে ঘটে ঠিক উল্টোটা। তারা মৃত মানুষটির স্মৃতি আঁকড়ে ধরে রাখেন, মৃত ব্যক্তির ব্যবহার করা জিনিসের প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেন এবং সেই স্মৃতির জগতেই ডুবে থাকতে চান।
পিজিডি আগে থেকেই ধরা সম্ভব
স্ক্যান করে পিজিডি নির্ণয় করা কঠিন হলেও, গবেষণা অন্য একটি দারুণ কাজে লাগতে পারে। নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্যাথরিন শিয়ার জানান, প্রিয়জন হারানোর পর কে পিজিডিতে আক্রান্ত হতে পারে, তা আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা একটি পরীক্ষায় শোকগ্রস্ত মানুষদের মস্তিষ্কের স্ক্যান করেন। কিছু মানুষের অ্যামিগডালার সংযোগে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে এবং ভবিষ্যতের পরীক্ষায় তাদের শোক আরও তীব্র হতে দেখা যায়। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের এই অস্বাভাবিক প্যাটার্ন দেখেই বিপদের আভাস পাওয়া সম্ভব। কে এই দীর্ঘস্থায়ী শোকের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে, তা আগে থেকেই বলে দেওয়া যায়।
চিকিৎসার গুরুত্ব
রোগটা আগে ধরতে পারলে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া সহজ হয়। সাধারণ বিষণ্নতার ওষুধ পিজিডি রোগীদের কোনো কাজেই আসে না। তাদের জন্য শোক কাটানোর বিশেষ থেরাপি প্রয়োজন হয়। সাধারণ শোক ও পিজিডির পার্থক্য ধরা তাই খুব জরুরি, তা না হলে চিকিৎসকেরা ভুল চিকিৎসা করে বসতে পারেন। এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
অনেকেই প্রিয়জন হারানোর শোক বছরের পর বছর কাটিয়ে উঠতে পারে না। তাদের কখনো ভুল বুঝো না। এটা তাদের কোনো দুর্বলতা নয়; তাদের মস্তিষ্কই হয়তো তাদের সেই স্মৃতির কারাগারে আটকে রেখেছে!
