দারিদ্র্যের শিকলে বন্দী হাসান সরকার: একসময়ের মেধাবী শিক্ষার্থীর করুণ পরিণতি
অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে না পারায় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে হাসান সরকারকে। সম্প্রতি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে তাঁর এই করুণ অবস্থা দেখা গেছে। একসময়ের মেধাবী শিক্ষার্থী হাসান সরকারের জীবন থমকে গেছে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে।
মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ
বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৪.৭৫ পেয়ে এসএসসি পাস করার পর হাসান সরকার ভর্তি হন রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। প্রকৌশলী হওয়ার ছিল তাঁর স্বপ্ন। তবে পড়াশোনার সময়ই মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। দারিদ্র্যের কারণে যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অসুস্থতা বেড়ে চলেছে।
পরিবারের সংগ্রাম ও চিকিৎসা বন্ধ
হাসানের বাবা মোবারক হোসেনের নিজের কোনো জমিজমা ছিল না। ছোট একটি ভাতের হোটেল চালিয়ে সংসার চলত। দুই ভাই ও দুই বোনের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ধারদেনা করে এবং সহায়-সম্বল বিক্রি করে হাসানের চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু ২০২০ সালে মা জাহানারা বেগম এবং ২০২২ সালে বাবা মোবারক হোসেন মারা যাওয়ার পর পুরোপুরি থেমে যায় তাঁর চিকিৎসা।
শিকলে বাঁধা পড়ার করুণ দৃশ্য
দৌলতপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনের ঘরে মাটির মেঝেতে বসে আছেন হাসান সরকার। পায়ে লোহার শিকল বাঁধা। দীর্ঘদিন চুল-দাড়ি না কাটায় জট বেঁধেছে, হাত-পায়ের নখ বড় হয়েছে। মাটিতে দীর্ঘ সময় ধরে শুয়ে-বসে থেকে শরীরে ঘা তৈরি হয়েছে। তিনি মাঝে মাঝে মৃদু স্বরে কিছু বলেন, আবার চুপ করে শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
পরিবারের বাধ্যবাধকতা ও সহযোগিতার আহ্বান
হাসানের ভাগনি শামীমা আক্তার বলেন, ‘টাকার অভাবে মামার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর পাগলামো বাড়তে থাকে, মানুষজন ভয় পেতে শুরু করে। উপায় না পেয়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। তিন বছর ধরে এভাবেই আছেন।’ সহপাঠী আবদুল মতিন জানান, স্কুলজীবনে হাসান সেরা শিক্ষার্থী ছিলেন। সমাজের বিত্তবান মানুষ বা প্রশাসন এগিয়ে এলে হয়তো তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহামুদুল হাসান বলেন, হাসানের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে তাঁর নামে প্রতিবন্ধী ভাতা করে দেওয়া হয়েছে। তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোনাব্বর হোসেন জানিয়েছেন, হাসানকে সহযোগিতা করার পরিকল্পনা আছে।
এই ঘটনা দারিদ্র্য ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ঘাটতির করুণ চিত্র তুলে ধরছে। হাসান সরকারের মতো অসহায় মানুষের জন্য সমন্বিত সহযোগিতা ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
