স্কুল ফোবিয়া: শিশুর আতঙ্কের কারণ ও অভিভাবক-শিক্ষকের করণীয়
স্কুল ফোবিয়া: শিশুর আতঙ্ক ও সমাধান

স্কুল ফোবিয়া: শিশুর আতঙ্কের কারণ ও অভিভাবক-শিক্ষকের করণীয়

নতুন জুতা, নতুন বইয়ের গন্ধ এবং বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড়—স্কুল বলতেই আমাদের চোখে এমন উজ্জ্বল ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু অনেক শিশুর কাছে ‘স্কুল’ শব্দটি এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়ায়। ঘুম থেকে ওঠার পর পেটব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব বা কান্নাকাটি শুরু করে তারা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে আমরা বলি স্কুল রিফিউজাল বা স্কুল ফোবিয়া। এটি কেবল জেদ নয়, এটি একটি গুরুতর মানসিক অবস্থা যা শিশুর দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে পারে।

স্কুল ফোবিয়ার লক্ষণ ও বয়সভিত্তিক প্রবণতা

স্কুল ফোবিয়া সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছর এবং ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। শিশুর মধ্যে যেসব লক্ষণ থাকতে পারে:

  • স্কুলে যাওয়ার সময় শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দেওয়া, যা স্কুল ছুটির পর ঠিক হয়ে যায়।
  • অতিরিক্ত কান্না, রাগ বা মা–বাবাকে আঁকড়ে ধরে রাখার প্রবণতা দেখা দেয়।
  • বুক ধড়ফড় করা বা অতিরিক্ত কান্নাকাটি করা।
  • স্কুলের কথা শুনলেই ঘুমের ব্যাঘাত হওয়া বা দুঃস্বপ্ন দেখা।

এই লক্ষণগুলো শিশুর মানসিক উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয় এবং সময়মতো চিকিৎসা না করলে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হতে পারে।

স্কুল ফোবিয়ার প্রধান কারণগুলো

গবেষণায় দেখা গেছে, ২ থেকে ৫ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো সময় স্কুল ফোবিয়ায় ভোগে। এর পেছনে সাধারণত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে:

  1. বিচ্ছিন্ন থাকার উদ্বেগ: এ ক্ষেত্রে শিশুদের মা–বাবার থেকে দূরে যাওয়ার ভয় সবচেয়ে বড় কারণ। তারা মনে করে তারা স্কুলে গেলে বাড়িতে প্রিয়জনদের কোনো বিপদ হতে পারে।
  2. পরিবেশগত চাপ: স্কুলে বুলিং, কোনো কঠোর শিক্ষক বা পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ শিশুর মনে ভীতির সৃষ্টি করে।
  3. সামাজিক উদ্বেগ: কিশোর বয়সে বন্ধুরা কী ভাবছে বা ক্লাসে পারফর্ম করতে না পারার ভয় থেকে স্কুল পালানোর প্রবণতা তৈরি হয়।

এ ছাড়া মা–বাবার ঝগড়া, অসুস্থতা, নতুন ভাইবোনের আগমন কিংবা শিশু বা কিশোরদের মধ্যে অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বা ডিপ্রেশনের উপস্থিতিও স্কুল ফোবিয়ার কারণ হতে পারে।

স্কুল ফোবিয়া কাটানোর উপায় ও করণীয়

এ ক্ষেত্রে শিশুর অভিভাবক ও শিক্ষক—উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রয়োজন। স্কুল ফোবিয়া কাটিয়ে উঠতে জোরজবরদস্তি নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা দেখানো। প্রথমে নিশ্চিত হোন শিশুর কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কি না। যদি সব স্বাস্থ্য পরীক্ষা স্বাভাবিক থাকে, তবে বুঝতে হবে এটি মানসিক উদ্বেগ। শিশুর ভয়ের কথা মন দিয়ে শুনুন, তাকে বকাঝকা না করে আশ্বস্ত করুন যে আপনি তার পাশে আছেন।

এক দিনে দীর্ঘ সময় স্কুলে না রেখে শুরুতে এক-দুই ঘণ্টার জন্য স্কুলে পাঠান। ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলুন যাতে স্কুলে শিশুটি নিজেকে নিরাপদ মনে করে। যদি দেখেন শিশুর উল্লিখিত আচরণ দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হচ্ছে এবং তার সামাজিক জীবন বা পড়াশোনায় বড় প্রভাব ফেলছে, তবে দেরি না করে একজন শিশু-কিশোর মনোরোগবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

ডা. টুম্পা ইন্দ্রাণী ঘোষ, শিশু–কিশোর মনোরোগবিশেষজ্ঞ