মনোবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হলো ‘পারসোনালাইজেশন’। এর অর্থ হলো যেকোনো ঘটনাকে নিজের সঙ্গে জুড়ে ফেলা বা ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া। উদাহরণস্বরূপ, বস যদি কোনো ভুল ধরিয়ে দেন, তাহলে আপনার মনে হতে পারে ‘আমি একজন খারাপ কর্মী’। অথবা কোনো বন্ধু যদি দেখা করতে না আসে বা শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বদলে দেয়, তাহলে আপনার ধারণা হতে পারে ‘সে আমাকে এড়িয়ে চলছে’।
বাস্তবতা কী?
কিন্তু বাস্তবে এসব ঘটনার বেশির ভাগই আপনার সঙ্গে খুব কমই সম্পর্কিত। বরং এর পেছনে পরিস্থিতি বা ওই ব্যক্তির ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে। অন্যের ‘মাইন্ড রিডিং’ করার সময় আমরা নিজেরাই গল্প বানাই। আমরা ধরে নিই, ‘ও হয়তো আমাকে অপছন্দ করে’ বা ‘ও আমার সম্পর্কে খারাপ ভাবছে’। কিন্তু সত্যটা হলো, আমরা অন্যের মনের কথা বা বাস্তবতা জানি না। আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।
আসল সত্য
আসল সত্যটা হলো, বস ফিডব্যাক দিয়েছেন; তিনি আপনার উন্নতি চান। বন্ধু আসেনি; সে হয়তো অসুস্থ বা ব্যস্ত। কেউ যদি কড়া বা কঠিন আচরণ করেন, তার মানে তিনি নিজেই মানসিকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় নেই; তাই তাঁর নিজের মেজাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি হয়তো নিজেই মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ সবকিছু আপনাকে কেন্দ্র করে নয়।
কীভাবে নিজেকে থামাবেন
১. নিজের ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করুন
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, এ রকম আচরণ করার আর কী কী কারণ থাকতে পারে? কেবল নেতিবাচক ব্যাখ্যায় আটকে থাকবেন না।
২. অন্যের জায়গা থেকে ভাবুন
কখনো কখনো মানুষ ফিডব্যাক দিতে অস্বস্তি বোধ করে বা তারা নিজেরাই নানা ধরনের সমস্যায় জর্জর থাকে। তাই অন্যের জুতায় পা গলিয়ে দেখুন।
৩. মন পড়া বন্ধ করুন
ধারণা না করে ভালোভাবে বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন। অথবা ধরে নিন, আপনি পুরোটা জানেন না। কিন্তু নেতিবাচক ‘গেসিং গেম’ খেলা বন্ধ করুন। তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে একটু থামুন। ভাবুন। অনেক সময় অনুভূতি সঠিক বাস্তবতাকে ধারণ করে না। অর্থাৎ আপনি ভুল বোঝেন।
৪. শেখার কী আছে
মনোবিজ্ঞান বলে, দুই ধরনের ‘ইগো’ আছে। এক. ‘আমি সবার থেকে আলাদা, সেরা বা ভালো বুঝি’। এটা খুবই দুর্বল ধরনের ইগো। অনেকে একে বলে ‘ভুল ইগো’। এটা আপনার ব্যক্তিত্বকে ভুল পথে চালিত করে। দুই. ‘আমি যেকোনো পরিস্থিতিকে সহজভাবে মেনে নিই। চেষ্টা করি। শিখি।’ এটা আপনাকে প্রতিনিয়ত আপনার সেরা ভার্সনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আপনি দ্বিতীয় ইগোটার চর্চা করুন। অন্যের আচরণ থেকে আপনার কি শুধরে নেওয়ার বা শেখার কিছু আছে? তাহলে সেটাই করুন। বাকিটা গুরুত্বহীন।
৫. ‘লেট ইট গো’
কেউ যদি আপনাকে আঘাত করে কথা বলেই থাকে, আপনি যদি শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের হন, তাহলে সেটা এড়িয়ে যান। যেখান থেকে শেখার কিছু নেই, নিজেকে ইতিবাচকভাবে ‘ইনপুট’ দেওয়ার কিছু নেই, সে ধরনের অপ্রয়োজনীয় ‘গার্বেজ’ প্রতিক্রিয়া মনে নেওয়ার কোনো মানে নেই। যিনি এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, এটি তাঁরই দুর্বলতা।
সবকিছু ব্যক্তিগতভাবে নিলে কী হয়?
সম্পর্ক খারাপ হয়। আত্মবিশ্বাস কমে যায়। ভুল–বোঝাবুঝি বাড়ে। অযথা কষ্ট পেতে পারেন। মনে রাখবেন, কেউ যদি আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেই ফেলেন, সেটার সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। সেটা তাঁর ব্যক্তিগত দুর্বলতা। আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ না রাখতে পারার অক্ষমতা। এ ধরনের বিষয়গুলো ব্যক্তিগতভাবে না নিলে আপনার নিজের অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা সহজ হয়।



