দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাবের পর এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীসহ সারা দেশে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকার ডেঙ্গু ও মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় কমিটি’ পুনর্গঠন করেছে। সিটি করপোরেশন এলাকাসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে।
কমিটির গঠন ও সদস্য
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীকে সভাপতি এবং প্রতিমন্ত্রীকে সহসভাপতি করে ৩১ সদস্যের এই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। সভাপতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সহসভাপতি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী, সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন এ বিভাগের সিনিয়র সচিব বা সচিব।
সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সিনিয়র সচিব বা সচিবরা। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিবরা সদস্য রয়েছেন।
সব ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী, রাজউক চেয়ারম্যান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক এবং সব সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা এই কমিটির সদস্য। বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টোমোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং নিপসমের অ্যান্টোমোলজি বিভাগের প্রধানকেও কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে।
কমিটির কাজ ও কার্যপরিধি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ২৭ মে এক পরিপত্রে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এই জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে সে সময় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পুনর্গঠিত কমিটির নতুন পরিপত্রে সুনির্দিষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি দেশজুড়ে ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান, গৃহীত ও বাস্তবায়িত কার্যক্রমের পর্যালোচনা, মূল্যায়ন, তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনা, জাতীয় নীতিমালা বা কৌশলপত্র প্রণয়ন ও হালনাগাদ এবং বছরে অন্তত চারটি সভা আয়োজন করবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কমিটির সভা-সেমিনারে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও উদ্যোগের ভিত্তিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সরকার তা বাস্তবায়ন করবে। কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে প্রয়োজনে অতিরিক্ত সদস্যও অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
প্রথম সভা ২৩ জুন
ডেঙ্গু প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় কমিটির এখনো কোনো সভা বা সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়নি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় কমিটির একটি বৈঠক ১৭ জুন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বিশেষ কারণে তা হয়নি। আগামী ২৩ জুন এ সভা হবে। আমরা সভার চিঠি পেয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সব সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি থাকবেন। তারা সবাই তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন। যেসব সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, কাজের ক্ষেত্রে সেগুলো হয়তো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এছাড়া সর্বসম্মতিক্রমে বিশেষ কোনো উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে। জাতীয় কমিটিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাই মিলে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সে অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
বিশেষজ্ঞের মতামত
চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা মনে করি, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে কয়েকটি সহজ কাজ করতে হবে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত একযোগে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এই অভিযান টানা দুই বা তিন দিন চলবে। প্রতিবছর দুবার এ অভিযান পরিচালিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘এই অভিযানের কাজগুলো হবে— এক. এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার আবাসস্থল এবং ডিম পাড়ার স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। দুই. সারা দেশে একযোগে মশা ও শূককীট নিধনে কার্যকর ওষুধ ছিটানো। বড় শহর, মফস্বল, শহরতলি এবং গ্রামাঞ্চলে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকর ওষুধ নির্বাচন করতে হবে। তিন. স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, আনসার-ভিডিপি সদস্য, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, এনজিওর কর্মকর্তা-কর্মীসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে যুক্ত করে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। চার. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত ডেঙ্গুর টিকা প্রদান শুরু করতে হবে। পাঁচ. ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার পর নয়, সারা বছর ধরে মশা নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গুর মতো তীব্র সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং মশামুক্ত দেশ গড়তে গৃহীত সব কার্যক্রমে সব শ্রেণির মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে সেটিই হবে সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি। বাস্তবমুখী ও প্রয়োগযোগ্য পরিকল্পনা এবং কৌশল প্রণয়নের দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। তবে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমে কখনও সংঘবদ্ধভাবে, কখনও পেশাগতভাবে এবং কখনও ব্যক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। সবাই দায়িত্ব পালন করলে ডেঙ্গুবিরোধী লড়াইয়ে আমাদের বিজয় অনিবার্য।’



