দেশে হামে আক্রান্ত এক লাখ ছাড়িয়েছে, মৃত্যু ৬৬৬ জনের
দেশে হামে আক্রান্ত এক লাখ ছাড়িয়েছে, মৃত্যু ৬৬৬

অবস্থার অবনতি হওয়ায় অন্য হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে হামে আক্রান্ত সাড়ে আট বছরের তানজিনা আক্তারকে। গতকাল ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের সামনে দীপু মালাকার দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। এ বছর ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ১ লাখ ৬৭৭ জন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। মানুষ শুধু হামে আক্রান্ত হচ্ছে তা নয়, হামে অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, হামে ৬৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫৭৩ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র।

টিকা সত্ত্বেও সংক্রমণ কেন?

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হামে এত আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। দেশব্যাপী শিশুদের টিকা দেওয়ার পরও কেন হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু থামছে না, তা নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। বিপরীতে কোন বয়সী মানুষ হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, টিকা পাওয়ার পরও শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে কি না, যেসব শিশু মারা গেছে তারা হামের টিকা পেয়েছিল কি না, এ ধরনের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশ করছে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন ও গবেষণা) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসনিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশব্যাপী শিশুদের টিকা দেওয়ার সুফল পাওয়া যাচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সংক্রমণ ও মৃত্যু কমছে। টিকা দেওয়া না হলে সংক্রমণ ও মৃত্যু আরও অনেক বেশি হতো।’ তবে তিনি বলেন, টিকা পাওয়ার পরও শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে কি না, যেসব শিশু মারা গেছে, তারা হামের টিকা পেয়েছিল কি না, এ ধরনের তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরীক্ষার তথ্য

দেশজুড়ে হাম শনাক্তের পরীক্ষা হয় শুধু জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে। ল্যাবরেটরির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালে দেশে ২৪৫ জন এবং ২০২৫ সালে ১২৫ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছিল; কিন্তু গত বছর ডিসেম্বর থেকে দেশে হাম বেড়ে যাওয়ার কিছু লক্ষণ দেখা যায়। এরপর এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে রোগী শনাক্ত বেশি হতে থাকে।

তবে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় মার্চ মাস থেকে। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় এই প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বক্তব্য

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) নিয়মিত টিকা কার্যক্রম থেকে প্রতিবছর কিছু শিশু বাদ পড়ে যায়। বাদ পড়া শিশুদের ক্রমপুঞ্জীভূত সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই বাদ পড়া শিশুর মোট সংখ্যা এক বছরে জন্ম নেওয়া শিশুদের সমান বা বেশি হলে হাম বা হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশ সেই পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল।

টিকা ক্যাম্পেইন

জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার একটি উপায় হচ্ছে টিকা ক্যাম্পেইন। অর্থাৎ একযোগে সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা। সরকার গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় হামের টিকা দেওয়া শুরু করে। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনে টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এই কার্যক্রম শুরু হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের লক্ষ্য ছিল ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬০৪ শিশুকে টিকা দেওয়া। ২০ মে টিকা কার্যক্রম শেষ হয়; কিন্তু এ পর্যন্ত টিকা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭২ হাজার ২৪ জন শিশুকে। দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বাড়তি ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৯৬০ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুরা টিকা নিতে এলে তাদেরও দেওয়া হয়। সে কারণে বেশি শিশু টিকা পেয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান

গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বুধবার সকাল আটটা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৯ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। এ সময় জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে ১৩৯ জনের হাম শনাক্ত হয়। ওই ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেট বিভাগে দুজন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে একজন করে রোগীর মৃত্যু হয়।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান এবং জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের সময় রোগটির উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে আসছে, তারা সবাই হামের রোগী। উপসর্গ নিয়ে যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তা হামেই মৃত্যু।

মুশতাক হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে সংখ্যা বলছে, হামে আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। হামে আক্রান্ত অনেকে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে পরামর্শ নেয়, অনেকে চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালেই যায় না। এদের হিসাব সরকারি পরিসংখ্যানে নেই।