রাজশাহী বিভাগে এইচআইভি সংক্রমণ বেড়ে ৭৯৪, সিরাজগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩১০
রাজশাহী বিভাগে এইচআইভি সংক্রমণ ৭৯৪, সিরাজগঞ্জে সর্বোচ্চ

রাজশাহী বিভাগে এইচআইভি সংক্রমণ ও আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বিভাগের আট জেলায় মোট ৭৯৪ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলায় সর্বোচ্চ ৩১০ জন, রাজশাহী জেলায় ১৩১ জন, বগুড়ায় ১০৯ জন, পাবনায় ৭৮ জন, নওগাঁয় ৬৫ জন, নাটোরে ৪৩ জন, জয়পুরহাটে ৩৭ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে সর্বনিম্ন ২১ জন আক্রান্ত রয়েছেন।

সমকামীদের মধ্যে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯২ জনই সমকামী, যা মোট আক্রান্তের ৬৬.১৮ শতাংশ। হাসপাতালে পরীক্ষা করা ১২ হাজার ৮৫২ জনের মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন, নারী ৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের একজন। বিবাহিত ৪৮ জন এবং অবিবাহিত ৬৭ জন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫-২৪ বছর বয়সী ৩৫ জন এবং ২৫-৫০ বছর বয়সী ৮০ জন আক্রান্ত।

গোপন নেটওয়ার্ক বড় আতঙ্ক

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, সচেতনতার ঘাটতি, সামাজিক সংকোচ এবং গোপন নেটওয়ার্কের কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠছে। রাজশাহী নগরীর সিঅ্যান্ডবি মোড় (শিমলা), কোর্ট স্টেশন, ডিঙাডোবা, ফুলতলা ও পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন স্থানে রাতে সমকামীদের নিয়মিত জমায়েত হয়। এছাড়া ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টেলিগ্রামের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গোপন গ্রুপের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ ও যোগাযোগ চলছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ সংক্রমণ শনাক্ত ও প্রতিরোধে জটিলতা সৃষ্টি করছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আক্রান্তের বক্তব্য

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আক্রান্ত এক ব্যক্তি বলেন, “অসচেতনতা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণে আমি এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছি। পরে রোগটি এইডস পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমাজে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।”

সামাজিক ও মানবিক সংকট

বারিন্দ কলেজ অব নার্সিং সায়েন্সেসের শিক্ষার্থী মাহাফুজা রাহাত বুশরা বলেন, “এইচআইভির বিস্তার শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক সংকটও। সচেতনতার ঘাটতি, ভুল তথ্য, সামাজিক স্টিগমা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ অনেক মানুষকে সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে।”

সচেতনতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন

আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোস’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা বলেন, “এইচআইভি আক্রান্তদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অংশ এখনও নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। এতে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এইচআইভি আক্রান্ত মানেই যে যৌন সংক্রমণ, তা কিন্তু নয়। সরকার বিনামূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছে, কিন্তু সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়াতে হবে।”

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “সমকামিতা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর নৈতিক অবক্ষয় ও মানবস্বভাববিরোধী আচরণ। এটি ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থি এবং সামাজিকভাবে পরিবারব্যবস্থা ও নৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে। অনিরাপদ যৌন আচরণ এইডসসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ধর্মীয় অনুশাসন, নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা ও স্বাস্থ্যসচেতনতার সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন।”

ঝুঁকি কমানোর উপায়

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন) ডা. মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, “পুরুষ সমকামীদের মধ্যে, বিশেষ করে রিসিভটিভ পার্টনারদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। পায়ুপথে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে, যা ঝুঁকি বাড়ায়। এইচআইভি শুধু যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে নয়; পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণ, একাধিক ব্যক্তির একই সিরিঞ্জ ব্যবহার, মাদক গ্রহণে সিরিঞ্জ ভাগাভাগি এবং মা থেকে শিশুর শরীরেও সংক্রমিত হতে পারে।”

রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ বলেন, “যৌন আচরণজনিত কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে সমকামীদের মধ্যে শনাক্তের হার বেশি। যৌনপল্লিতে যাতায়াতকারীদের মধ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক। তবে আক্রান্তদের শনাক্ত হওয়া ইতিবাচক, কারণ এতে তারা চিকিৎসার আওতায় আসেন এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।”