স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার সংকট: নেতাদের বিদেশমুখীতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার সংকট: নেতাদের বিদেশমুখীতা ও বাংলাদেশ

স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার সংকট: নেতাদের বিদেশমুখীতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

একটি দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ আমলা আর প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা যখন উন্নত চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিদেশে যান, তখন আমজনতা ভাবতেই পারে যে নিজ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর তাঁদের যথেষ্ট আস্থা নেই। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক, কারণ দেশটি এখন ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের শেষভাগ পর্যন্ত দেশে ৬২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী এবং প্রায় ৮,৫০০ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ৫০০-এর বেশি সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের আওতায় ঘাটতি, সরবরাহ-সংকট, ভুল তথ্যের বিস্তার এবং জনআস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। টিকা সংগ্রহ, মজুত ব্যবস্থাপনা কিংবা অতীতের সিদ্ধান্ত নিয়ে পারস্পরিক দোষারোপের এক লম্বা পর্ব শেষে সরকার দেশব্যাপী জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিন্তু হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুযাত্রা থামছে না। স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি তাই আমাদের আমজনতার ভরসাও কোনোভাবে শক্তপোক্ত হচ্ছে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দশকের পর দশক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরও আমাদের ক্ষমতাবান মানুষগুলোও কেন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছেন না?

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গর্বের সঙ্গে ওষুধ রফতানি করছে। টিকাদান কর্মসূচিতেও বাংলাদেশ অতীতে উল্লেখ করার মতো সাফল্য দেখিয়েছে। তারপরও স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আমাদের আস্থা বেশ নড়বড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনীতিবিদেরা বরাবরই বিদেশ গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আসেন। এমনকি শহরের সচ্ছল পরিবারগুলোর মধ্যেও এখন বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে প্রায় আট লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশ যান, আর এতে তাঁদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়। এদের অর্ধেকেরই বেশি যান প্রতিবেশী দেশ ভারতে।

একটু সামর্থ্য থাকলেই চিকিৎসার জন্য বাঙালিরা ছুটে যান থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া আর শ্রীলঙ্কা। এখানে প্রশ্ন কেবল উন্নত প্রযুক্তি বা সেবা নিয়ে নয়; এটি মূলত আস্থার সংকট।

মানুষ চায় নির্ভরযোগ্যতা, জবাবদিহি, পরিচ্ছন্নতা, মানবিক আচরণ, সঠিক রোগনির্ণয়ের সক্ষমতা, নৈতিক ও যুক্তিযুক্ত চিকিৎসা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। যখন এসব বিষয়ে ঘাটতি দেখা যায়, তখন যাদের সামর্থ্য আছে তাঁরা বিকল্প খোঁজেন।

চিকিৎসা শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ

আস্থার এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থা নিঃসন্দেহে অনেক শক্তিশালী। প্রতিবছর ভারত, নেপাল, ভুটান এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত শিক্ষার্থী বাংলাদেশে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে আসেন। অনেক বাংলাদেশি চিকিৎসক বিদেশে কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করছেন এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সুনাম অর্জন করেছেন। অর্থাৎ দক্ষ মানবসম্পদ, অ্যাকাডেমিক সক্ষমতা এবং চিকিৎসা শিক্ষার ভিত্তি আমাদের আছে।

এত কিছুর পরও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারার মতো স্বাস্থ্যব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। সম্প্রতি ছয় নবজাতকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার। অর্থাৎ অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবে সরকার। কিন্তু এতে স্বাস্থ্যসেবার ওপর আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসবে না। কারণ, এর সঙ্গে আরও জড়িয়ে আছে সুশাসন, জবাবদিহি, কমপ্লায়েন্স, অবকাঠামো, নৈতিকতা, গবেষণা, রোগীসেবা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্ন।

নেতাদের ভূমিকা ও মালয়েশিয়ার উদাহরণ

যারা দেশ চালান, তাঁরাই যদি চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হন, তখন পুরো বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কথায় কথায় চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার সুযোগ থাকলে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়নে তাঁদের তাগিদ আসবে কোত্থেকে? তাঁরা তো এমনিতেও ভিআইপি প্রটোকলের কারণে জনাকীর্ণ হাসপাতাল, জনবল সংকটে ভোগা ক্লিনিক কিংবা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। এভাবে জনবিচ্ছিন্ন থেকে নেতৃত্ব পর্যায়ের কেউ কোনও দেশে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া একটি সুন্দর উদাহরণ।

১৯৮৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির বিন মোহাম্মদ গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে বাইপাস সার্জারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি সেই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে মালয়েশিয়াতেই চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর মাধ্যমে তিনি তাঁর দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি অটল আস্থা প্রকাশ করেছিলেন। একইসঙ্গে জনগণের কাছেও একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছাতে পেরেছিলেন যে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বমানের চিকিৎসা দিতে সক্ষম।

এরপর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা, নার্সিং মান এবং বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ উন্নয়নে বিনিয়োগ করে আর উন্নত অবকাঠামো, মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ফেলে মালয়েশিয়া। ধীরে ধীরে তাঁদের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মানুষের এমন আস্থা তৈরি হয়েছে যে আজ মালয়েশিয়া আঞ্চলিক চিকিৎসা পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র। প্রতিবছর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার রোগী সেখানে চিকিৎসা নিতে যান।

মাহাথির মোহাম্মদের একটি ছোট্ট সিদ্ধান্ত আর পরবর্তীকালে সরকারি পর্যায়ে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গিই দেশটিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে।

আস্থার সংকট ও সমাধানের পথ

দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন বিদেশি স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করেন, তখন স্থানীয় হাসপাতাল উন্নয়নের জন্য কোনও চাপ থাকে না। ফলে জবাবদিহি দুর্বল হয়ে ওঠে, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মানসম্মত সেবার কোনও মানদণ্ড থাকে না। এর অর্থ এই নয় যে নেতাদের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া নিষিদ্ধ করা উচিত। স্বাস্থ্যসেবা একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজের ও পরিবারের জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চাইবে।

কিন্তু নেতৃস্থানীয় মানুষদের আচরণ বা সিদ্ধান্ত সাধারণ জনগণকে অনেক ধরনের বার্তা দেয়। একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকে আস্থার সংকট শুরু হলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কখনোই উন্নতি আসবে না।

নীতিনির্ধারকরা নিজেরাই যদি বিদেশি স্বাস্থ্যসেবা বেছে নেন, তখন জনগণের কাছে এটাই প্রতীয়মান হয় যে স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন তাঁদের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। প্রায় ২০ কোটি মানুষের একটি দেশ অন্য দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে—নিজের স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করতে পারে না।

স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো—দেশের যেকোনও শহরের মানুষ যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্থানীয় হাসপাতালেই দক্ষ, সম্মানজনক ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশা করতে পারেন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং প্রকৃত সংস্কার নিশ্চিত করতে হলে নেতা ও নাগরিক—উভয়কেই স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নিয়ে আসতে হবে। নেতাদের উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে নিজেদের চিকিৎসা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে। কারণ স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার প্রতি এই অঙ্গীকারই পারে প্রয়োজনীয় সংস্কারকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে। নেতারা নিজেরাই যখন স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখবেন, তখনই নাগরিকদের আস্থা ফিরবে। আর সেই আস্থার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যৎ।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত