স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেছেন, সরকার নারীর স্বাস্থ্যকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বাংলাদেশে অন্তত একটি, সম্ভব হলে দুটি ওমেন্স হেলথ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যেখানে বিশেষায়িত সেবা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ থাকবে।
প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য
বুধবার (২৪ জুন) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের (বিসিসিএফসি) কার্নিভাল হলে ‘ইমপ্রুভিং এসআরএইচআর ইন ঢাকা’ প্রকল্পের সমাপনী ফলাফল উপস্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। হাসপাতালের অবকাঠামো, জনবল, ওষুধ সরবরাহ ও সাপ্লাই চেইনে নানা সংকট রয়েছে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা
প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের ভিত্তি হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রায় ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। শিগগিরই পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে আরও নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে যেখানে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য উচ্চ অগ্রাধিকার পাবে এবং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।
ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য বাজেট
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের অল্পদিনের মধ্যেই হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে হয়েছে এবং সামনে ডেঙ্গুর মৌসুম রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
মুহিত বলেন, সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবার যখন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, তখন পুরো পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শারীরিক বিপর্যয় নেমে আসে। সেই মানবিক বিপর্যয় থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য মানবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা চলছে। কিডনি কেয়ার, ক্যান্সার কেয়ার ও ওমেনস হেলথ সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে।
লক্ষ্য হলো প্রত্যেক জেলায় অন্তত ক্যান্সার ও কিডনি-সংক্রান্ত সেবা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে অধিকাংশ মানুষ নিজ জেলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে পারেন।
প্রকল্পের সাফল্য
প্রকল্প পরিচালক ডা. জিয়াউল আহসান প্রকল্পের পাঁচ বছরের কার্যক্রম ও ফলাফল তুলে ধরে বলেন, কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ১০ লাখের বেশি নারী, কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীর কাছে এসআরএইচআর বিষয়ক তথ্য পৌঁছানো হয়েছে।
প্রকল্প-সহায়তাপ্রাপ্ত বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৩ জন সেবা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত সেবা নিয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫১ জন, মাসিক নিয়মিতকরণ (এমআর) সেবা পেয়েছেন ১৬ হাজার ৯৯৩ জন, এমআর-পরবর্তী ও গর্ভপাত-পরবর্তী সেবা (পোস্ট অ্যাবরশন কেয়ার) নিয়েছেন ৩২ হাজার ৫৪৯ জন এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা সংক্রান্ত সেবা পেয়েছেন ১১ হাজার ৪৫০ জন।
প্রকল্পের আওতায় রেফারেল হাসপাতাল, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র, তৈরি পোশাক কারখানার স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সাধারণ চিকিৎসকদের চেম্বারসহ মোট ১৬৫টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে সক্ষম করে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬৬ জন স্বাস্থ্যসেবাদাতাকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া পরিবার পরিকল্পনা, এমআর-পোস্ট অ্যাবরশন কেয়ার ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা সংক্রান্ত মানসম্মত রিপোর্টিং টুল, ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা প্রদানের সক্ষমতা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তরুণদের সম্পৃক্ততা
প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তরুণদের সম্পৃক্ততা। এক হাজার তরুণ স্বেচ্ছাসেবীকে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম, স্কুলভিত্তিক প্রচারাভিযান এবং সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন যোগাযোগ কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে আইপাশ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. সাঈদ রুবায়েত বলেন, বাংলাদেশের নগর স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে নগরের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এসআরএইচআর সেবা নিশ্চিত করতে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে। তিনি সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে কানাডার হাইকমিশনের হেড অব কো-অপারেশন স্টিফেন উইভার।



