থম্পসন শহরের একঝলকছবি: লেখকের পাঠানোথম্পসনের ডায়েরিতে প্রথম পর্বে আমরা পড়েছিলাম, কীভাবে থম্পসন শহরের জৌলুশ হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। এবার কাজের কথায় আসি, আমার অফিসের রিপোর্টিং টাইম সকাল নটায়। বাসা থেকে অফিসের দূরত্ব ১০ মিনিটের মতো। জানালা দিয়ে অফিস দেখা যায়। সময়মতো হাজির হয়ে দেখি আরও একজন উপস্থিত। পরিচয় দিয়ে বলল, ওর নাম বিবেক ত্রিবেদী। আরেকজন অমুদা ওম্বুটু। ম্যানেজার এখনো আসেননি। অমুদা আফ্রিকান মেয়ে। গত বছর জয়েন করেছিল। আমি ব্যাগ খুলে রেখে কিছুটা অবসর হতেই ম্যানেজার এসে উপস্থিত, জুলিয়েট হোলিক। সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে অফিসের নিজ নিজ কাজের জায়গা, ল্যাপটপ, ফোন বুঝিয়ে দিল জুলিয়েট। পাবলিক হেলথ ইন্সপেক্টরের ইন্টার্নশিপে জয়েন করেছি। চার মাস ধরে চলবে ট্রেনিং। এরপর যার যার কাজের জায়গায় পোস্টিং হয়ে যাবে।
প্রথম দিনের কাজ
বসে পড়লাম ল্যাপটপ নিয়ে। সাইনইন, পাসওয়ার্ড, সফটওয়্যারের কাজ বুঝে নিতে নিতেই বেশ কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। মধ্যাহ্নভোজের পর জুলিয়েট অমুদাকে বলল আমাদের ইন্সপেকশনে নিয়ে যেতে। ট্রেনিংয়ের কাজ আজ থেকেই শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। ইন্সপেকশনের প্রয়োজনীয় জিনিসপাতির একটা ব্যাগ, সরকারি আইডি, জ্যাকেটও দেওয়া হলো। মূলত একজন পাবলিক হেলথ ইন্সপেক্টরের কাজ বহুবিধ। প্রধানত রেস্তোরাঁসহ সব ধরনের ফাস্টফুড চেইন, পাবলিক কিচেনসহ এমন কোনো প্রতিষ্ঠান, যেখানে জনসাধারণের জন্য খাবার প্রস্তুত করা, পরিবেশনের কাজ হয়, সেসব জায়গায় পরিদর্শক হিসেবে কাজ করতে হবে। জনগণের জন্য প্রস্তুতকৃত খাদ্য আহার, উৎপাদন সম্পূর্ণ নির্ভেজাল, জীবাণুমুক্ত পরিবেশে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে করা হচ্ছে, এটা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে আসে পরবর্তী কাজের জায়গাগুলো। যেমন অভিযোগের ভিত্তিতে কারও বাসায় ইন্সপেকশন। সরাসরি যাওয়া যাবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যগত কোনো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আর প্রবেশের অনুমতি না পেলে তখন কোর্টের ওয়ারেন্ট অর্ডার নিয়ে যেতে হবে।
বিভিন্ন ধরনের ইন্সপেকশন
লেখকের অফিসছবি: লেখকের পাঠানোসুইমিংপুলের ইন্সপেকশন। বিভিন্ন ধরনের সুইমিংপুল রয়েছে। কোথাও কোনো রোগের কারণে মহামারি পরিস্থিতি তৈরি হলে যেতে হবে। পাবলিক হেলথ ইন্সপেক্টরের কাজ হচ্ছে রোগের সূত্র খুঁজে বের করা এবং এর ব্যাপকতা সীমাবদ্ধ বা প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যাতে এটি আর বাড়তে (ছড়িয়ে পড়তে) না পারে। এ ছাড়া ছোটখাটো সবজি-ফল, মাছ, মাংস, বিক্রির দোকান, সব ধরনের মুদিদোকান, গ্যাস স্টেশনের খাদ্যদ্রব্য বিক্রির ইন্সপেকশন করা। এ ছাড়া রাজ্যভেদে আরও অনেক রকমের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যেমন গ্রীষ্মের সময়ে সমুদ্র উপকূলবর্তী তীরের জল পরীক্ষা করা, যেখানে জনসাধারণের অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে। আরও একটা বিষয়ে অবশ্যই পাবলিক হেলথ ইন্সপেক্টরের ভূমিকা অনস্বীকার্য—কোনো মেলা আয়োজনের পূর্বে, চলাকালে ও শেষে। এরপর মাঝেমধ্যে রাস্তায় যাঁরা খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করেন, তাঁদেরও ছাড়পত্র নিতে হয়। ওই অনুমতিপত্র ছাড়া কোনো প্রকার বিক্রি, লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধু তা-ই নয়, একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে বাসা থেকে রান্না করে কোথাও খাবারদাবার সাপ্লাই করার ক্ষেত্রে।
এসব ছাড়াও একজন সরকারি কর্মকর্তার আরও বহুবিধ কাজ থাকে। অফিসের প্রতিদিনের কাজ, মিটিংসহ আরও নানা আনুষঙ্গিক কাজ থাকে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ
অন্যান্য হেলথ ইউনিটে গাড়ির ব্যবস্থা না থাকলেও এই শহর অজপাড়াগাঁ হওয়ায় মানুষের এখানে আসার আগ্রহ শূন্যের কোঠায়। সেটা বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রতিটি অফিসারের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করেছে। আমার জানামতে, প্রধান শহরগুলোতে নিজস্ব গাড়ি ছাড়া চাকরির গতি নেই।
এই গেল পাবলিক হেলথ ইন্সপেক্টরের কাজকর্মের কিছুটা নমুনা। আমাদের দেশে যেমন খাদ্যে ভেজাল যাচাই করার জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়, তেমনি এখানে এটা নিত্যদিনের কাজের মধ্যে পড়ে। কাজ একই, কিন্তু পার্থক্য আকাশ-পাতাল। আমাদের দেশের অফিসারদের প্রতিনিয়তই বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় এবং সেগুলোর ছবি, ভিডিও ভাইরাল হয়ে আমাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। অন্যদিকে এখানে অফিসারের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই অধিকাংশ মালিক, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা—সবাই সতর্ক অবস্থানে থেকে সব অসংগতি ঠিক করার জন্য তোড়জোড় শুরু করেন। কারণ, তারা ভালো করেই জানেন, যদি পাবলিক হেলথ ইন্সপেক্টর হেলথ পারমিট আটকে দেন বা বাতিল করেন, তাহলে দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর অন্য কোনো উপায় থাকবে না।
আমাদের প্রতিদিনের কাজের কিছুটা অংশ পাঠকদের জন্য দিলাম।
থম্পসনের ইতিহাস
লেখকের অফিস কক্ষছবি: লেখকের পাঠানোআবার ফিরে আসি থম্পসনের ইতিহাসের পাতায়। এই আজব শহরের জৌলুশ কেমন ছিল, তা আগের পর্বে আপনাদের বলেছি। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা যায়, আশির দশক থেকে শুরু হয় মাদকদ্রব্যের অবাধে বেচাকেনা। থম্পসন শহরকেই বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ এর অবস্থান, যাতায়াতের কেন্দ্রস্থল ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব। ম্যানিটোভার উত্তরাঞ্চলে এত বড় শহর আর নেই। যদিও মাদক পাচারকারীদের প্রধান আকর্ষণ সব সময়ই ছিল আশপাশের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে, যেখানে গ্রীষ্মকালীন আকাশপথ ছাড়া যাতায়াতের কোনো মাধ্যম নেই। চারিদিকেই অসংখ্য নদীপথের মধ্যে দ্বীপের মতো জেগে ওঠা অগণিত জনপদ। কিছু নামও বেশ অদ্ভুতুড়ে—Kapuskaypachik, Kosapachekaywinasinne, Kosapechekanesik, Wapawsik, Mistuhekasookun, Kakapawanis. এসব শব্দ মূলত ক্রি (Cree) উপজাতিদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা থেকে এসেছে। আমাদের যেমন রয়েছে চট্টগ্রাম বা বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলের চাকমা বা মারমা সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা।
আরও পড়ুন থম্পসনের ডায়েরি: পর্ব–১১৭ মে ২০২৬শীতের সময়ে উত্তরাঞ্চলের তীব্র ঠান্ডায় নদীর পানি জমাট বেঁধে সড়ক চলাচলের উপযুক্ত পথ তৈরি হয়। দুর্গম এসব অঞ্চলগুলোতে মাদক পাচারকারীরা নিজেদের একচেটিয়া বাণিজ্য গড়ে তুলেছে বলে জানা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতও এসব জায়গায় নিতান্তই অসহায়। এ সুযোগে এর ডালপালা গজিয়ে মাদক বাণিজ্য হয়ে উঠেছে বিশালাকৃতির অশ্বত্থগাছ। আরও অনেক কারণ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে আলোচনায় আসবে।
প্রথম ইন্সপেকশন
ফিরে আসি নিজের কর্মযজ্ঞে। আজকেই আমাদের ইন্সপেকশনের প্রথম দিন। অমুদা আমাদের নিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজের পরপরই বেরিয়ে পড়ল। প্রথম গন্তব্যস্থল হিসেবে বেছে নিল সবারই খুব পরিচিত খাবারের জায়গাকে—কেএফসি। আমরা গাড়ি থেকে নেমে প্রবেশ করতেই অমুদা সরকারি আইডি দেখিয়ে নিজের এবং আমাদেরও পরিচয় দিল। এখানকার সবাই ওকে খুব ভালোভাবেই চেনে। কিন্তু এটাই নিয়ম। সরকারি কর্মকর্তা যখন নিজের দায়িত্ব পালনে প্রবেশ করবেন, তখন প্রথমেই পরিচয়পত্র প্রদর্শনপূর্বক কাজ শুরু করবেন। তা না হলে একে পরিদর্শন বলে গণ্য করা হবে না! ক্রমশ...



