দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব: শিশুদের উপর চাপ বাড়ছে, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার
সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা শিশু স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮৩ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীদের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাদান কর্মসূচির বিস্তারিত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ধারণা, হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দেড় মাস স্থায়ী হতে পারে। ইতিমধ্যে, বেশি সংক্রমণযুক্ত এলাকাগুলোয় (হটস্পট) টিকাদান কার্যক্রম চলছে। দেশব্যাপী টিকাদান শুরু হবে ২০ এপ্রিল থেকে, যা চার সপ্তাহ ধরে চলবে। এর পাশাপাশি, আক্রান্ত শিশুদের বিচ্ছিন্ন রেখে (আইসোলেশন) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করছেন, টিকাদান, আইসোলেশন এবং মানুষের সতর্কতার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে হামের সংক্রমণ কমে আসতে পারে। গতকাল রাজধানীর জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে আয়োজিত একটি কর্মশালায় ইপিআই-এর পক্ষ থেকে হামের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের শিশুদের বর্তমানে হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। ২০২৩ সালে, ৮৬ শতাংশ শিশু টিকার প্রথম ডোজ এবং ৮১ শতাংশ শিশু দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে, কিন্তু চার থেকে পাঁচ বছরে টিকা না পাওয়া বা অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক।
টিকাদান কর্মসূচির সময়সূচি ও লক্ষ্য
টিকাদান কর্মসূচির বিস্তারিত সময়সূচি নিম্নরূপ:
- ৫ এপ্রিল থেকে ৩০টি উপজেলায় টিকাদান শুরু হয়েছে।
- ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান চলছে, যা চার সপ্তাহ ধরে অব্যাহত থাকবে।
- ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে টিকাদান শুরু হবে, চার সপ্তাহ ধরে চলবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান জানিয়েছেন, হটস্পট এলাকাগুলোতে টিকাদান শুরু করা হয়েছে এবং আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব নিম্নগামী হবে।
হামের ঝুঁকি ও জটিলতা
হাম যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে, তবে শিশুদের মধ্যেই এর প্রকোপ, জটিলতা ও মৃত্যু বেশি দেখা যায়। হামের জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, এনকেফালাইটিস, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা এবং শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্ত। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, হাম প্রতিরোধে টিকার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, টিকার দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন শুরু হলে সাধারণত দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রাদুর্ভাব কমতে দেখা যায়।
পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৯২ জন নতুন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬ জনের হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে। এ বছরের জানুয়ারিতে প্রথম হাম শনাক্ত হয় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে। এ পর্যন্ত সারা দেশে ৩,০৬৫ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, এবং হামে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি।
ইপিআই থেকে জানানো হয়েছে, দেশের ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এক ডোজ হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে, এমনকি আগে টিকা পেয়ে থাকলেও বা আক্রান্ত হয়ে থাকলেও। টিকা দেওয়া হবে নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন, ইবতেদায়ি, মক্তব, এতিমখানা ও শিশু আশ্রমে, এবং যেসব শিশু স্কুলে যায় না, তারা স্থানীয় টিকাদান কেন্দ্রে টিকা পাবে।
হাম নির্মূলের লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ
২০২৬ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ থেকে হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল, কিন্তু চলমান প্রাদুর্ভাবের কারণে এটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ড. বিনোদ কুমার বলেছেন, টিকা কার্যক্রম সঠিকভাবে চালানো হলে শিশুরা সুরক্ষিত থাকবে। বাংলাদেশ ঘনবসতি পূর্ণ দেশ হওয়ায় হামের জীবাণু দ্রুত ছড়ায়, এবং টিকা গ্রহণের হার কম হওয়ায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীন বলেছেন, হামে শিশুমৃত্যু কাম্য নয় এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, টিকাদান ও অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে।



